15/08/2025
গতকাল এ রুটি বানানোর বেলুনটার ছবি দিয়েছিলাম। পরে ভাবলাম এ বেলুনের কাহিনি লিখব। তাই ছবিটা সরিয়ে ফেলি।
ইতোমধ্যে আপনারা জানেন আমি কিশোরগঞ্জে সিনিয়র সহকারী জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
দিনকয়েক আগে এক ভদ্রলোক আবেদন করলেন, তার স্ত্রী আত্নহত্যার হুমকি দেন। তিনি এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন।
তার আবেদনের প্রেক্ষিতে তার স্ত্রীকে নোটিশ প্রদান করা হয় ও গতকাল উভয়কে আসতে বলা হয়।
আমি নিয়মিত আদালতের কাজ একরকম গুছিয়ে প্রতিদিন ঠিক তিনটা থেকে লিগ্যাল এইড অফিসে বসি। কিছু শুনানির পর এ দম্পতি আসেন।
অভিযোগকারীকে জিজ্ঞেস করি, স্ত্রী আত্নহত্যা করতে চান কেন?
তিনি বললেন তার স্ত্রী এমনই। বিয়ের পর থেকেই এমন করেন। তাদের তিনটা বাচ্চা আছেন ও গত একযুগে তিনি এ কষ্ট করে চলেছেন।
তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন তিনি আত্নহত্যা করার হুমকি দিয়েছেন।
মহিলা বললেন, স্যার আগে ওকে জিজ্ঞেস করুন সেদিন কী হয়েছিল?
ভদ্রলোক বললেন, হালকা কথা কাটাকাটি হয়েছিল।
মহিলা চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, শুধু কথা কাটাকাটি?
ভদ্রলোক বললেন, কথা কাটাকাটিই তো!
: তুমি আমাকে মারো নাই?
: হালকা মারছি!
আমি বললাম, আপনি এমন একটা পেশায় থেকে (তার পেশার নাম বললাম না। কারণ এটা ব্যক্তির দোষ, পেশার না।) আপনি স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেছেন!
: স্যার মেজাজ গরম হইছিল। হালকা মারছি।
: তুমি আমাকে মেরে রুটি বানানোর বেলুন ভেঙে ফেলো নাই!
: বেলুনটা পুরনো ছিল!
: "এটা পুরনো বেলুন!"
বলেই মহিলা ব্যাগ থেকে বেলুনটা বের করল!
আমি রুটি বানানোর বেলুনটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
চিন্তা করা যায় এদেশের মাস্টার্স পাশ করা কোন স্বামী স্ত্রীকে মেরে রুটি বানানোর বেলুন ভেঙে ফেলে আবার সাফাই গায়, বেলুনটা পুরনো!
এরপর আমি তাদের পুরো কাহিনি শুনলাম। এ লোক কিছু হলেই গায়ে হাত তোলে!
ভদ্রমহিলা কেঁদে বললেন, স্যার বাচ্চাদের সামনে মার খেতে খেতে মনে হয় মরে গেলেই বেঁচে যাব। তাই আত্নহত্যার কথা বলি।
জেনে অবাক হবেন ভদ্রমহিলা একটা সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজন শিক্ষক তার ক্লাসে ন্যায়পরায়ণতার শিক্ষা দিলেও তার ঘরেই তিনি অন্যায়ের শিকার হচ্ছেন।
আমি লোকটাকে বললাম, আজ বিচারক হয়েছি বলে বেঁচে গেছেন। আর যদি কোনদিন আপনার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেন খোদার কসম আমি প্রথমে আপনার এমডিকে জানাব, এরপর মহিলাকে দিয়ে মামলা করাব। একমাত্র মা, বাবা ও শিক্ষক ছাড়া কারো গায়ে হাত তোলার এখতিয়ার কারো নাই।
আমার কথায় লোকটা ভয় পেল। লিখিত নিলাম। উভয়কে মিলিয়ে দিলাম আর শিক্ষিকাকে বললাম, আপস করতে করতে জীবনটাকে পাপস বানিয়ে ফেলবেন না। একজন শিক্ষক নিজেই এসব মেনে নিলে তার শিক্ষকতা করার কোন নৈতিক অধিকার থাকে না!
লিগ্যাল এইড অফিসের নাম্বার দিয়ে দিলাম আর বলে দিলাম, এরপর গায়ে হাত তুললে শুধু আমাদের জানাবেন। কুকুরের লেজ ক্যামনে সোজা করতে হয় তা কাজী শরীফ জানে!
মহিলা বললেন, স্যার আমার একমাত্র ভাই ডাক্তার। খুব ঠাণ্ডা মানুষ। আমার এ অবস্থা দেখে ও খুব কষ্ট পায়।
তাকে অভয় দিয়ে বললাম, ডাক্তার সাহেবকে বলবেন আপনার আরেক ভাই আছে যে ডাক্তারের মত মেধাবী না, আবার এত ঠাণ্ডাও না!
মহিলা হেসে দিলেন। সে হাসিতে আমি সাহস দেখেছি, আস্থাও দেখেছি।
মাঝেমাঝে এসব দেখলে মনে হয়, জীবন আসলেই বড্ড বিচিত্র আর মনে প্রশ্ন জাগে আমরা প্রকৃত শিক্ষিত কবে হবো?
কাজী শরীফ
সিনিয়র সহকারী জজ
ও ভারপ্রাপ্ত লিগ্যাল এইড অফিসার, কিশোরগঞ্জ।
১২ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।