03/05/2026
"শ্বাস নিতে পারছে না,শ্বাস নিতে পারছে না" বলে ইমারজেন্সি তে এক ঝাক মানুষের আগমন
প্রত্যেকের পরিধেয় কাপড় দেখে প্রতিয়মান হচ্ছে
উহারা বিয়ে বাড়ি হতে আগত জনগোষ্ঠী
জনগোষ্ঠী কহিলাম কারন এক বা দুই নয় ২৫/৩০জনের বহর
১৭/১৮ বছরের মেয়ে
বড়, বড় হা করে নি:শ্বাস নিচ্ছে ঠিক পানি থেকে মাছ ডাঙায় তুললে যেমন হা করে শ্বাস নেয় ঠিক তেমন করে "বড় বড় চোখ করে হা করে আছে"
মনে প্রানে শ্বাস নিতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না
ধরাধরি করে তাকে ইমারজেন্সি র বেডে দেয়া হলো
পুরো বেড ঘিরে মানুষ
মেয়ের মা,নানী, চাচী,বোন,চাচা,স্বামী আরো নাম না জানা আত্নীয়
মেয়ে বাংলা সিনেমায় সাইড হিরো/হিরোইন মারা যাওয়ার সময় যেভাবে শেষ কথা বলে যায়, ঠিক সেভাবে কথা বলার চেষ্টা করছে...
মেয়ের হাত ধরে আছে বোন, পা ম্যাসাজ করছে মা
মাথার কাছে প্রাণের স্বামী
মেয়ে সেকেন্ডে সেকেন্ডে বাংলা সিনেমার আনোয়ারের মত "আমেনার মা, আ আ " বলে বুকে হাত দিয়ে মিলিসেকেন্ডে র জন্য নকল apnea তে চলে যাচ্ছে
Myocardial infarction এর রোগীর মত বুকে হাত দিয়ে শ্বাস আটকে ফেলছে বার বার
সেই বুকে ব্যাথার চিকিৎসা হিসেবে
অতি ভালোবাসায় আক্রান্ত চিন্তিত স্বামী তার chest massage করে দিচ্ছে
"ও শ্বাস নিতে পারছে না,শ্বাস নিতে পারছে না,দম আটকে গেছে দেখেন তাড়াতাড়ি "
বলে বার বার তাগাদা দিচ্ছে মেয়ের মা,বোন আর স্বামী
প্রেশার দেখলাম নরমাল
অক্সিমিটার নষ্ট তাই নিরুপায়,
স্যাচুরেশন দেখতে পারছি না
তবে আমি বুঝে নিয়েছি এটা HCR
তবুও জানতে চাইলাম
"কিছুখনের মধ্যে কিছু হয়েছে??
ইতিহাস ঘাটিয়া শুনিতে পারিলাম
মেয়ে র সমবয়সী ছোটো খালা র বিয়ে হয়েছে আজ
খালার বিদায়ের সময় ভাগ্নীর মানে আমার রোগীর কাঁদতে কাঁদতে শ্বাস আটকে গেছে অর্থাৎ Emotional breakdown
বিয়ে বাড়ির অর্ধেক লোক ইমারজেন্সি তে
সুন্দর সুন্দর ঝলমলে কাপড় পরিহিত মানুষে
ইমারজেন্সি রুম গিজ গিজ করছে
আমি placebo নীতি তে চলে গেলাম,
মেয়ে কে অক্সিজেন দিলাম কারণ উত্তেজিত জনতা কে দমাতে অক্সিজেনের বিকল্প নাই
নচেৎ কিছুই করছি না র অভিযোগে
পিঠে কিল পরিতে পারে
আর কিল পরিয়া কাইত হইয়া গেলে, আমার মাথার পাশে বসার কেহ নাই আপাদত
ইসিজি করানো শুরু করলাম
পুরো গ্রুপের মধ্যে বিচক্ষণ মনে হলে নানী কে
নানী র বয়স মায়ের চেয়েও কম মনে হচ্ছে যাইহোক
নানী কে ইশারায় বললাম "কিছু হয়নি উনার কিন্তু এরকম করতে থাকলে আমার কিছু করার থাকবে না"
সে বললো "আমি বুঝছি বিষয় টা"
মেয়ে যেভাবে হা করে করে শ্বাস নিচ্ছে তাতে যেকোনো সময় lock jaw হয়ে যাবে নইলে অতিরিক্ত hyperventilation এর জন্য Tetany
বহু বুঝিয়ে ও তার মুখ বন্ধ করতে পারছি না
নানী ও বুঝাতে লাগলো
"মিষ্টি (ছদ্দ নাম) তুই একটু শান্ত হ,এরকম করলে দম আটকে যাবে শান্ত হ"
একজন কে বললাম জ্যুস কিনে নিয়ে আসেন
উদ্দেশ্য জ্যুস মুখে দিলে অন্তত হা করা মুখ টা বন্ধ হবে
মেয়ে এক সিপ নিয়ে গরগরার মত গলার মধ্যে রেখে দিলো
না গিলছে, না ফেলছে এ আরেক মহা মুশকিল
এরমধ্যে ইমারজেন্সি তে আরো ৬/৭ টা রোগী জমে গেলো(এদের গল্প পরে আরেকদিন বলবো)
MLSS রেজা বেশ বিরক্ত হয়ে গেটে দাড়িয়েঁ আছে, কাউকে ভেতরে আসতে দিচ্ছে না,বার বার আমাকে ইশারায় HCR কে যাতে বিদায় করি বলছে,ও চাচ্ছে একদল গেলে আরেক দল আসুক
আমার জ্যুস আইডিয়া ফেল হলেও আমি হার মানলাম না
মিষ্টি কে অক্সিজেন দিয়ে
ওদের কে বললাম "মিষ্টি কি খেতে পছন্দ করে??
সবাই একযোগে বলে উঠলো "দুধ চা"
মিষ্টির প্রাণের স্বামী কে বললাম:
"এখনি ভালো করে দুধ চা নিয়ে আসেন বাইরে থেকে,
ও যেভাবে চিনি দুধ দিয়ে খায় সেভাবে,ফার্স্ট ক্লাস দুধ চা নিয়ে আসেন"
কয়েকজন চা আনতে চলে গেলো ততক্ষণে আমি অন্য রোগী দেখা শুরু করলাম
এরমধ্যে এক এসল্টের মেয়ে এসেছে স্বামীর কাছে উদোম কেলোনি খেয়ে(এই Rapunzel এর গল্প ও পরে বলবো)
Rupanzel মাইর খেয়েছে শুনে
মিষ্টির মা বলে উঠলো
"তুই মাইর খাস কেন??জামাই তোর গলা কাটার আগে, ওর গলা কেটে তুই জেলে যাবি,
তুই মরতে যাবি কেন,আগে মাইরা তারপর মরবি"
চা গরম চলে এসেছে
মিষ্টি কে বসানো হলো
আমি অনান্য রোগী দেখছে আর পাশাপাশি মিষ্টির দিকেও খেয়াল রাখছি
মিষ্টির পরিবার Hum sath sath hein র পরিবার
অনেকেই নিজেকে মিষ্টি র বাবা মা নামে অবিহিত করছে যেকারণে বুঝা যাচ্ছে না কে আসল বাবা মা
মিষ্টি চা খেলো অল্প
আমি অন্য রোগী দেখার পাশাপাশি গল্প করছি
সবাই বললো "মিষ্টি ভাত না খেয়ে চা খায় তাই ওর চা খাওয়া নিষেধ, এজন্য ও চুরি করে চা খায়"
এতক্ষণে আমার তীর সঠিক নিশানা য় গিয়ে পরেছে
আমি: আজ কোনো নিষেধ নাই,
আরো দুই কাপ চা এনে দেন ওকে ,বিল আমি দিবো আজ
বিয়ে বাড়ির অর্ধেক লোক চলে এসেছে
স্টেজে কনে দেখার মত করে ইমারজেন্সি রুমে
একের পর এক নানী,দাদী,মামী,মামা এসে মিষ্টি কে দেখে যাচ্ছে
আমি: সব তো এখানেই চলে এসেছেন
আপনাদের হাসপাতালে ই বিয়ের আয়োজন করা উচিৎ ছিলো,সেই সুবাদে একটা বিয়ে খেতে পারতাম
পোলাও মাংস মিস হয়ে গেলো আমার
সবাই হেসেঁ বলে, ঠিক ঠিক
ঘড়ির কাটায় ১০টা,
মেয়ে উঠে বসেছে, স্বামী বোনের কানে কানে বললো
"বাসায় যেতে চায়"
আমি বললাম: আচ্ছা যার আজ বিয়ে হলো সে কেদেঁছে??
এই প্রশ্নে দুই পক্ষ তৈরি হলো
একদল হ্যা কাদঁছে, আরেকদল না কাদেঁনি বলে
তর্কে জড়ালো
আমি: আচ্ছা ওর নিজের বিয়েতে ও কেদেঁছে??
সবাই: নাহ,ও হাসঁছে
আমি: হুম,প্রেম কাহিনি নিশ্চয়ই??
সবাই হাসেঁ
সামনে উপবিষ্ট সবাই কে বললাম:
এখন ওর ট্রিটমেন্ট হলো এরপর থেকে যে বিয়েতে গেলে ও কাদঁবে সে বিয়েতে ওকে নেয়া যাবে না,
কাদঁলে বিয়ে বা বিদায়ে যাওয়া নিষেধ আজ থেকে
মেয়ের চাচা: আচ্ছা, যে বিয়েতে গেলে হাসঁবে সে বিয়েতে নিয়ে যাবো
যাওয়ার আগে মেয়ের বাবা,চাচা,স্বামী বললো:
ধন্যবাদ ম্যাডাম
আপনি দেখে এতখন রেখে চিকিৎসা দিলেন অন্য কেউ হলে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দিত,আপনাকে অনেক ধন্যবাদ
আমি: যাওয়ার আগে আপনাদের ছবি তুলে নেই
এলবামে থাকুক,বসেন সবাই
আমি মানুষ জন্মের বদরাগী হইলেও মাঝে মইধ্যে আমি ভালা
অত:পর বিয়ে বাড়ির মেহমান বিদায় দিয়ে আরো জটিল কেসে মনোনিবেশ করিলাম
তোমার মনের অস্থিরতায় দিও আমায় ঠাঁই
জ্বরের ঘোরে, প্রলাপের ভিরে আছি সর্বদাই
Ismat Alo
MBBS,BCS,MD(Paediatrics)
আজীবনের মেডিকেল অফিসার