04/06/2024
সরিষাবাড়ীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসঃ
১) তদানিন্তর বৃটিশ শাসনামলে বর্তমান চর
সরিষাবাড়ী ছিল আদি সরিষাবাড়ী।
খরস্রোতা যমুনার কড়াল গ্রাসে আদি
সরিষাবাড়ী বিলুপ্ত। তখন নদীর নাব্যতা
ছিল, চলাচল করতো ষ্টীমার, জলজাহাজ।
নদী বিধৌত চার ইউনিয়নের পিংনা,
পোগলদিঘা, আওনা, কামরাবাদ এর
অধিকাংশ ভূমিতেই সরিষা আবাদ হতো।
বীর অঞ্চলের চারটি ইউনিয়নেও প্রচুর
সরিষা আবাদ হতো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল
হতে বানিজ্য করার লক্ষ্যে ব্যবসায়ীরা
সরিষা কিনতে আসত। সে সময়কাল হতেই এই
স্থানটির নাম রাখা হয় সরিষাবাড়ী। তবে
-কে কবে, কোথা্য়, কোন সময়ে ও কোন
তারিখে এই স্থানটির নামকরণ করেন তার
সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
২) যমুনা বিধৌত ঝিনাই, সুবর্নখালী
বেষ্টিত এই সরিষাবাড়ী পূর্বে কাগমারী
পরগনায় অবস্থিত ছিল।
৩) পাটশিল্প সমৃদ্ধ সরিষাবাড়ীতে ২২টি
পাটের কুঠি ছিল। প্রায় ২২,০০০ বাইশ
হাজার শ্রমিক পাটের কুঠিগুলোতে কর্মরত
ছিল। বাংলাদেশের পাট ব্যবসায়ী কেন্দ্র
হিসেবে নারায়নগঞ্জের পরই সরিষাবাড়ীর
স্থান ছিল। আজ তা বিলুপ্তির পথে।
৪) বৃটিশ শাসনামলে সরিষাবাড়ীর ৫নং
পিংনা ইউনিয়নে ফৌজদারী আদালত
ছিল। কুম্ভকার সম্প্রদায় এর মাটির হাড়ি-
পাতিল তৈরীতে পিংনা ইউনিয়ন এখনো
বিখ্যাত। ১৮৯৬ সালে পিংনা উচ্চ বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠিত হয়। মহাকবি কায়কোবাদ,
পিংনাতে পোস্টমাস্টার পদে
থাকাকালীন অবস্থায় আযান কবিতা রচনা
করেন।
৫) ডোয়াইল ইউনিয়নে প্রচুর হিন্দুদের
বসবাস ছিল। ডোয়াইলের চরের মুগ ডাল ছিল
প্রসিদ্ধ। বৃহত্তর ময়মনসিংহে ডোয়াইলের
মুগ ডাল সোনামুগ হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল।
৬) পোগলদিঘা সরিষাবাড়ী উপজেলার
সর্ববৃহৎ ইউনিয়ন। এশিয়ার সর্ববৃহৎ ইউরিয়া
সারকারখানা সরিষাবাড়ীতে অবস্থিত।
৭) মহাদান ইউনিয়নের খাগুড়িয়া গ্রামের
নামানুসারে ঐতিহ্যবাহী খাগুরিয়া কালী
মন্দিরের নামকরণ করা হয়েছে। সুদূর ভারত
হতে এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন
উপাসনার জন্য আসে এবং তিনদিনব্যাপী
মেলা বসে। এই মন্দিরের নামকরণ করা
হয়েছে শ্রী শ্রী খাগড়িয়া কালী মাতা
মন্দির। এছাড়া বছরে আরো ৪টি মাঝারী
হিন্দুধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়।
৮) পুরাতন জগন্নাথগঞ্জ ঘাট ষ্টীমার
ষ্টেশন ছিল। নদীর নাব্যতা হারানোর ফলে
ষ্টীমার ঘাটটি বিলুপ্ত। এটি আওনা
ইউনিয়নের অন্তর্গত ছিল।
৯) রাজনৈতিক বিবর্তনের ধারাবাহিকতায়
১৩৩৫ বাংলা সনে প্রতিষ্ঠিত শ্রী শ্রী
রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম বিভিন্নভাবে বিভিন্ন
সময় স্থানান্তরিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি
সরিষাবাড়ী পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডে
অবস্থিত। বাংলাদেশের ২৩টি
প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটি একটি মানব
সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান।
১০) সরিষাবাড়ী সদরে দুটি বাজার দুই
দিকে অবস্থিত।একটি শিমলা বাজার ও
অপরটি রামনগর বাজার। পাকিস্তান
আমলের শেষের দিকে মরহুম রিয়াজউদ্দিন
তালুকদার রামনগরের নাম পরিবর্তন করে
আরামনগর বাজার নামকরণ করেন।
সূত্রঃ বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন।
পিংনা, সরিষাবাড়ী, জামালপুরঃ
পিংনা মহাকুমা শহরে প্রথম ১৮৮৩ সালে
টেলিগ্রাম চালু এবং ১৯৭২ সালে সাব
পোস্ট অফিস স্থাপিত হয়। সরিষাবাড়ীর
পিংনায় এরও আগে টেলিগ্রাম ও পোস্ট
অফিস স্থাপিত হয়। একসময় মহাকবি
কায়কোবাদ পিংনা পোস্ট অফিসের পোস্ট
মাস্টার ছিলেন। এখানে অবস্থান কালেই
তিনি তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ
“মহাশ্মশান” রচনা করেন। ১৯০৫ সালে
ধনবাড়ীর জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী
চৌধুরীর অর্থানুকূল্যে কাব্যগ্রন্থটি প্রথম
মুদ্রিত হয়। সরিষাবাড়ীর পিংনা এক সময়
ছিল ব্যস্ত নদীবন্দর। পিংনা নদী বন্দর
থেকে সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ,
কলকাতার সাথে অবাধে ব্যবসা-বাণিজ্য
চলতো। বৃটিশ আমলে পিংনাতে ফৌজদারী
কোর্ট, মুনসেফ কোর্ট, আদালত, বড় বড়
পাটের কুঠি, শিা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি
ছিল। যমুনা নদীর তীরবর্তী অবস্থিত
পিংনার সাথে ততকালীন রাজধানী
কলকাতা শহরের সরাসরি স্টিমার
যোগাযোগ ছিল। নারায়ণগঞ্জের সাথেও
পাট ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল এই
পিংনা। অন্যান্য স্থানের পাট
ব্যবসায়ীরা এই নদী বন্দর ব্যবহার করে এবং
এখানকার পাট ক্রয়ের সিল দিয়ে মণ প্রতি
দশ টাকা বেশি আয় করতো। শিা
প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে জামালপুর জেলা
যখন অন্যান্য জেলা গুলোর চেয়ে অনেক গুণ
পিছিয়ে, শিক্ষার আলো থেকে এ অঞ্চলের
মানুষ যখন বঞ্চিত নিগৃহিত, ঠিক সেই
মুহূর্তে বাংলা সংস্কৃতির পীঠস্থান
কলকাতা নগরকেন্দ্রিক শিক্ষা
সাংস্কৃতিক পীঠস্থানের শিল্প
সাহিত্যের ঢেউ এসে পড়েছিল এই
পিংনাতে। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয়
সর্ব সাধারণের মিলিত প্রচেষ্টায় ১৮৯৬
সালের সেপ্টেম্বর মাসে পিংনা হাই স্কুল
স্থাপিত হয়। তখন এর অবস্থান ছিল বর্তমান
পিংনা স্বাস্থ্য উপকেন্দ্রের সন্নিকটে।
যার উত্তর পাশে অবস্থিত ছিল বিরাট
আদালত ভবন। ১৯০৭ সালে শ্রী শশী মোহন
চৌধুরী বিদ্যালয়টিকে বর্তমান অবস্থানে
স্থানান্তরিত করেন। তাঁর অকান্ত
প্রচেষ্টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
অনুদান প্রাপ্তি হয় স্কুলটি। প্রিন্সিপাল
ইব্রাহীম খাঁ ১৯০৬ সালে পিংনা হাই
স্কুলে ভর্তি হন। তিনি ১৯১২ সাল পর্যন্ত
এখানে অধ্যয়ন করেন। সাহিত্যিক
প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ প্রথম মুসলমান
ছাত্র যিনি পিংনা হাই স্কুল থেকে
এন্ট্রাস (বর্তমান এস.এস.সি) পাশ করেন।
“বাতায়ন” নামক গ্রন্থে তিনি পিংনা তথা
পিংনা হাই স্কুলের অনেক স্মৃতির কথাই
উল্লেখ করেছেন। তৎকালীন অবিভক্ত
বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে
ফজলুল হক ১৯৩৯ সালে পিংনা হাই স্কুল
পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে সফর সঙ্গী
ছিলেন হোসেন সোহরাওয়ার্দী, খাজা
নাজিম উদ্দিন ও মৌলভী তমিজ উদ্দিন
খান প্রমুখ। ঐতিহ্যবাহী সেই পিংনাতে
আজ আর সেই কোর্ট নেই, মুনসেফ আদালত
নেই, সেই মানুষ নেই, সেই ব্যস্ততা নেই,
সেই নদী বন্দর নেই। যেখানে বসে কবি
কায়কোবাদ কাব্য রচনা করেছেন, যে
মসজিদের আযানের ধ্বনি শুনে তিনি
বিখ্যাত আযান কবিতা রচনা করেছিলেন
সেই সুপ্রাচীন মসজিদটি আজ যমুনা নদীর
করাল গ্রাসে বিলীন হবার উপক্রম।
প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর স্মৃতি বিজড়িত
সেই বিদ্যাপীঠ পিংনা হাই স্কুলটি
সংস্কারের অভাবে আজ জড়াজীর্ণ,
অবহেলিত।
সূত্রঃ amader [email protected]
১৯০৪ সালে প্রকাশিত শ্রী কেদারনাথ
মজুমদারের অমূল্য গ্রন্থ ‘ময়মনসিংহের
বিবরন’ থেকে জানা যায়, ১৭৮৩ সালে ৩৯টি
পরগনা নিয়ে ময়মনসিংহ জেলা ঘোষিত
হয়। গোপালপুর উপজেলাসহ উত্তর
টাঙ্গাইলের পুরো অংশ তখন পুখুরিয়া
পরগনার অন্তর্গত ছিল। গোপালপুর যমুনা
বিধৌত হওয়ায় সকল প্রকার যোগাযোগ হতো
নদী পথেই। এজন্য হেমনগর উপজেলার
ঝাওয়াইল ইউনিয়নের সোনামুই গ্রামের
দক্ষিনে সুবর্ণখালি গ্রামে গড়ে উঠে
বিরাট নদী বন্দর। এ সুবর্ণখালি বন্দরে
ভিড়তো বড় বড় স্টিমার। আসামের
হাড়গিলা থেকে ঢাকার মানিকগঞ্জ
পর্যন্ত এ স্টিমার চলতো। এ সুবর্ণখালি
বন্দরের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য
১৮৯৯ সালে ময়মনসিংহ-জগন্নাথগঞ্জঘাট
রেলওয়ে চালু হয়। পিংনা থেকে সুবর্ণখালি
পর্যন্ত সড়ক পাকা করা হয়। এটিই গোপালপুর
থানার প্রথম পাকা সড়ক। সুবর্ণখালি থেকে
পিংনা হয়ে জগন্নাথগঞ্জঘাটের রেলপথ
থেকে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকায় যোগাযোগ
হতো। আর এ সুবর্ণখালি বন্দর থেকে ৪
কিলো উত্তরে অবস্থিত যমুনা তীরবর্তী
পিংনায় পৃথক থানা এবং জজ আদালত
স্থাপন করা হয়। পিংনা বর্তমানে
সরিষাবাড়ি উপজেলার একটি প্রসিদ্ধ
ব্যবসা কেন্দ্র। তবে বর্তমানে গোপালপুর
উপজেলার সুবর্ণখালি বন্দর বা জনপদের
কোন অস্তিত্ব নেই। যমুনার ভাঙ্গনে
শতাব্দী প্রাচীন এ বন্দর বিলুপ্ত হয়ে
গেছে। তবে এর উত্তর পাশে সোনামুই নামক
একটি জনপদ গড়ে উঠেছে। সমসাময়িক
গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, উনবিংশ
শতাব্দীর তৃতীয় দশকে পিংনা থানা ও জজ
কোর্ট স্থাপিত হয়। সেসময়ে পিংনায়
একটি তহশিল কাচারি ও স্থাপন করা হয়।
নৌপথে কোলকাতার সাথে যোগাযোগের
সুবিধাহেতু পিংনায় এসব সরকারি অফিস
আদালত স্থাপন করা হয় বলে অনেকের
ধারনা। বর্তমান গোপালপুর, ভূঞাপুর,
ধনবাড়ি এবং জামালপুরের সরিষাবাড়ি
উপজেলার প্রশাসনিক, রাজস্ব এবং বিচার
ব্যবস্থা এ পিংনা থেকেই পরিচালিত
হতো। এম আবদুল্লাহর ময়মনসিংহের নতুন
ইতিহাস, অধ্যাপক খন্দকার আব্দুর রহিমের
টাঙ্গাইলের ইতিহাস এবং টাঙ্গাইল জেলা
পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত ‘টাঙ্গাইলের
ইতিহাস’ গ্রন্থের সূত্র থেকে বলা যায়,
১৮৬৯ সালে টাঙ্গাইল থানা মহকুমা
হিসাবে মর্যাদা পাওয়ার সময় গোপালপুর ও
কালিহাতিতে পুলিশ ফাঁড়ির অস্তিত্ব
ছিল। তখন গোপালপুর পুলিশ ফাঁড়ি ছিল
পিংনা থানার অধীন। ১৯০৪ সালে
কেদারনাথ মজুমদারের গ্রন্থে দেখা যায় ঐ
সময়ে টাঙ্গাইল সদর থানা, কালিহাতি
থানা এবং গোপালপুর থানার অস্তিত্ব
ছিল। তখন গোপালপুরের প্রান কেন্দ্র ছিল
সুবর্ণখালি বন্দর এবং থানা শহর ছিল
পিংনা। সুবর্ণখালি ও পিংনার
নামডাকের জন্য মধুপুর উপজেলার
আমবাড়িয়ার জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরী
১৮৮৫ সালে সুবর্ণখালি বন্দরের অদূরে তার
রাজবাড়ি নির্মান করেন। পরবর্তীতে
সুবর্ণখালি যমুনার ভাঙ্গনে বিলীন হলে
শিমলাপাড়া মৌজায় এসে তিনি পুনরায়
পরীদালান নামে একটি রাজবাড়ি নির্মান
করেন। যেটি এখনো কোনভাবে টিকে
আছে। পরবর্তীতে হেমচন্দ্র চৌধুরীর নামে
এ গ্রামের নাম হয় হেমনগর। ১৯০৭ সালে সর্ব
প্রথম গোপালুর-পিংনা টেলিগ্রাফ অফিস
স্থাপিত হয়।
সূত্রঃ gopalpur.tangail.gov.bd
জগন্নাথগঞ্জ ঘাট, সরিষাবাড়ী,
জামালপুরঃ জগন্নাথগঞ্জ ঘাট মানুষের
মনের মণিকোঠায় শুধুই স্মৃতি হয়ে আছে।
স্মৃতির মণিকোঠায় জ্বলজ্বল করে জ্বলবে
বহুদিন ধরে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার
বর্তমান জামালপুর জেলাধীন সরিষাবাড়ী
থানার অন্তর্গত ব্রিটিশ আমলের
ব্রিটিশদের গড়া বাংলাদেশের অন্যতম
নৌবন্দর জগন্নাথগঞ্জ ঘাটটি। ব্যবসা-
বাণিজ্য এবং যাত্রী পারাপারের
সুবিধার্থে অখণ্ড ভারতবর্ষে ব্রিটিশ
সরকারের যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ
হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল কলকাতার
সঙ্গে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট, সিরাজগঞ্জ ঘাট,
বাহাদুরাবাদ ঘাট এবং ফুলছড়ি ঘাট।
স্থলপথের সঙ্গে নৌপথের সেতুবন্ধ রচনার
অংশ হিসেবে এসব বাণিজ্য বন্দর এবং
নৌযোগাযোগ কেন্দ্র গড়ে তোলা
হয়েছিল। এই প্রাচীন নৌবন্দরগুলো
ব্রিটিশ আমলে মালামাল সরবরাহ এবং
যাত্রী পারাপারের জন্য ছিল এক
যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রতিদিন হাজার
হাজার মানুষ যাতায়াত করত এই
জগন্নাথগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ ঘাট হয়ে।
পার্বতীপুর জংশন হয়ে কুষ্টিয়া, যশোর,
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং
কলকাতার পশ্চিমবঙ্গ হয়ে সারা
ভারতবর্ষে। এদিকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ হয়ে
ঢাকা, ঢাকা হয়ে সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ, আর
টেকনাফ হয়ে বার্মা। যাত্রীদের
কলকাকলিতে মুখরিত সেই জগন্নাথগঞ্জ
ঘাট আজ মৃত। লঞ্চ নেই, স্টিমার নেই, নেই
আমাদের প্রিয় সোহ্রাওয়ার্দী স্টিমারটি,
নেই ফেরি ভেড়ার প্লাটফর্ম, নেই বুকিং
ক্লার্ক, দোকানপাট, হোটেল, রেস্তোরাঁ,
হোটেলের বয়, হোটেল মালিক, নেই
রাতযাপন, নেই ঘুম থেকে উঠে গরম বয়েল
ডিম খাওয়া, নেই নাস্তা খাওয়ার ভিড়,
নেই গরম চা, চা গরম চা গরম বলে চিৎকার।
চানাচুর, এই চানাচুর, খাঁটি বোম্বে চানাচুর,
পাউরুটি, এই পাউরুটি, এই গরম ডিম, এই গরম
ডিম বলে চিৎকার। নেই ফেরিওয়ালাদের
এই মালা, এই মালা, মাত্র দুই টাকায়
পাচ্ছেন একটি লকেট, চেন, কলম, পেন্সিল,
মানিব্যাগ আর পাচ্ছেন একটি চিরুনি।'এই
জগন্নাথগঞ্জ ঘাটটির নামকরণ করা
হয়েছিল ব্রিটিশ আমলের এক জলমহালের
জমিদার সমাজসেবী জগন্নাথবাবুর
নামানুসারে। যার নামানুসারে বর্তমান
'জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়' এবং ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের 'জগন্নাথ হল' মাথা উঁচু
করে দাঁড়িয়ে আছে। একটি প্রবাদ আছে,
'জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো' সেই
কর্মগুণে জীবন্ত হয়ে আছে জগন্নাথ বাবুর
নামটি।আমাদের স্মৃতিতে আজও ভাসে
জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের স্মৃতি। কত কবি,
শিল্পী-সাহিত্যিক, চিত্রতারকাদের
আনাগোনা ছিল এই জগন্নাথগঞ্জ ঘটে।
পাড়ি জমাত এপার থেকে ওপারে। কত
রাজনীতিবিদ, জেলখানার কয়েদি পার
হয়ে যেত এই ঘাট হয়ে তার কোনো ইয়ত্তা
নেই। মনে পড়ে চিত্রতারকা 'আজিম' পাখি
শিকার করতে এসেছিলেন এই জগন্নাথগঞ্জ
ঘাট সংলগ্ন চরে। কত মানুষের ভিড়ে
'আজিম'কে দেখেছি, কথা বলেছি, আরও কত
কী যে! চিত্রতারকা রাজ্জাক, শাবানা,
ববিতা, টেলি সামাদ এসেছেন এই
জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে, শুটিং করতে এসেছেন
এফডিসির পরিচালক ও কর্মকর্তারা।
জগন্নাথগঞ্জ ঘাট আরও অনেক স্মৃতিরই জন্ম
দিয়েছে। যেমন_ ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান এসেছিলেন এই জগন্নাথগঞ্জ
ঘাটে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন
এবং ছয় দফা আন্দোলনের ওপর বিশাল
জনসভায় ভাষণ দেওয়ার জন্য। চারদিকে শুধু
মানুষের ঢল। বহুদূর থেকে দেখেছিলাম
বঙ্গবন্ধুর সেই সুউচ্চ মাথাখানি, আর হাত
নেড়ে নেড়ে বক্তৃতা দেওয়ার দৃশ্যটি আজও
স্মৃতিপটে জাগরূক হয়ে আছে। ১৯৭১-এর
স্বাধীনতা আন্দোলন-পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের
সময় পাক হানাদার বাহিনী এই
জগন্নাথগঞ্জ ঘাটেই ঘাঁটি করে বাঙ্কার
তৈরি করে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে
প্রায়ই বনের হিংস্র জীব-জন্তুদের মতো
গ্রামে গ্রামে ঢুকে অভিযান চালিয়ে
অনেককেই ধরে নিয়ে জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের
প্লাটফর্মে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে
যমুনার জলে ফেলে দিয়েছে এবং গ্রামের
কৃষকদের গরু, ছাগল, ভেড়া, চাল-ডাল, এমনকি
গাছের ডাব-নারিকেল পর্যন্ত নিয়ে যেত।
এছাড়া অনেকেই লিস্টেড আওয়ামী লীগ
নেতাকর্মীকে এবং হিন্দুদের যাকে
যেখানে পেয়েছে ধরে নিয়ে জগন্নাথগঞ্জ
ঘাটের প্লাটফর্মে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা
হয়েছে এবং গ্রামের ভেতরে ঢুকে আওয়ামী
নেতাকর্মীদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে।
জগন্নাথগঞ্জ ঘাট থেকেই পাক হানাদার
বাহিনীর অপারেশন মুক্তিবাহিনীর
ক্যাম্পগুলো উড়িয়ে দেওয়ার জন্য
পার্শ্ববর্তী বারইপটল গ্রামে
মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে
মুক্তিবাহিনীসহ সাধারণ গ্রামবাসীর
প্রায় একশ'জন নিহত হন এবং পরবর্তী সময়ে
এই গ্রামের নামকরণ করা হয় শহীদনগর।
বর্তমানে সেই জগন্নাথগঞ্জ ঘাটটি যে
জায়গাটিতে অবস্থিত, সেখানে কোনো
ফেরি যোগাযোগ নেই, লঞ্চ নেই, প্লাটফর্ম
নেই, শুধু দুটি ট্রেন আসে আর যায়। প্রাচীন
ঘাটটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে অনেক
আগেই। এখন আর স্টিমার চলে না,
সোহ্রাওয়ার্দী স্টিমার আর নেই, আর নেই
সোহ্রাওয়ার্দী স্টিমারের দোতলায়
দাঁড়িয়ে যমুনার বিশুদ্ধ বায়ুপান করা,
বাতাসে মাথার চুল এলোমেলো করে
দেওয়ার সেই রোমান্টিক পরিবেশ। এখন আর
নেই লঞ্চ, স্টিমার, ঘন ঘন ট্রেনের আগমন-
নির্গমন, নেই ভারতীয় মালামালবাহী
সুউচ্চ বিরাটকায় স্টিমারের নোঙর করে
বসে থাকা। আছে শুধু সারা রাত-দিন মিলে
দু'একটি ট্রেনের আগমন এবং প্রত্যাগমন এবং
কিছুক্ষণ অপেক্ষা, যাত্রীদের ভিড় নেই,
হকারের হাঁকাহাঁকি, ডাকাডাকি নেই,
আছে শুধু একটি দোচালা টিনের ঘর। সেখান
থেকে দু'চারটা টিকিট বিক্রি হয়। আর
আছে দু'একটি পান-সিগারেটের দোকান।
আজ মরে গেছে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট। কিন্তু
রেখে গেছে অগণিত স্মৃতি, যা ঝলমল করছে
যাত্রীদের মনমন্দিরে। এই তো দুনিয়া! এই
তো জীবন! এ পৃথিবীর কিছুই স্থায়ী নয় সবই
নশ্বর, ধ্বংসশীল এবং ক্ষণস্থায়ী!
সূত্রঃ দৈনিক সমকাল।