22/12/2020
🌾মণিপুরী সমাচার🌾
সিলেট বিভাগের অন্তর্ভুক্ত সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলাগুলোতে "মণিপুরী" জনগোষ্ঠীর বসবাস। বর্তমানে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের মধ্যে অন্যতম হলো "মণিপুরী সম্প্রদায়"। বুননশিল্পে অত্যন্ত দক্ষ তারা। সচারাচর নিজেদের কাপড় নিজেরাই বুনে।মণিপুরীদের উৎপাদিত তাঁতপণ্যের মধ্যে রয়েছে- ফানেক (মণিপুরীদের বিশেষ এক ধরনের পোশাক), শাড়ি, শাল, ওড়না, থ্রি-পিস, গামছা, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, বিছানার চাদর ইত্যাদি।
মণিপুরী ভাষায় তাঁতকে বলে ‘ইয়োং’। ইয়োং সাধারণত দুই ধরনের। মোয়াং ও পাং। মোয়াং তাঁতে তৈরি করা হয় মোটা সুতার কাপড়। আর চিকন সুতার কাপড় তৈরি হয় যে তাঁতে তার নাম পাং তাঁত।
🧵সুতার ধরণ, রঙ এবং নকশাঃ
একটা সময় তারা শুধু নিজেদের প্রয়োজনে তাঁতের কাপড় বুনলেও ধীরে ধীরে এটি বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে বাজারে মণিপুরী শাড়ির বেশ কদর। কারণ, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে মণিপুরী শাড়ি এখন যেকোনো সম্প্রদায়ের ফ্যাশন সচেতন নারীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। রঙ ও নকশা দেখলেই বোঝা যায় মণিপুরী শাড়িকে। কারণ, মণিপুরী শাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য হলো- এর নকশায় মৈরাং (টেম্পল) বা মন্দিরের প্রতিকৃতি থাকবে। তাই প্রায় প্রতিটি শাড়ির আঁচল, জমিন ও পাড়ের নকশায় দেখা যায় এই প্রতিকৃতি। মণিপুরী শাড়ি তৈরি হয় বরাবরই উজ্জ্বল রঙের সুতায়। বর্তমানে আঁচল, জমিন ও পাড়ে মন্দির প্রতিকৃতির পাশাপাশি আঁচল ও জমিনে বিভিন্ন নকশা থাকে। শাড়ির রঙ, নকশায়ও এসেছে পরিবর্তন। অনেক তাঁতিই শাড়ির রঙ, বুননে, নকশায় বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছেন। নিয়মিত চলছে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রাজশাহীর সিল্ক সুতা দিয়েও বুনা হচ্ছে মণিপুরী শাড়ি। সিল্ক সুতার তৈরি মনিপুরী শাড়ি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি মসৃণ ও হালকা। সিল্ক সুতার মণিপুরী শাড়িও পেয়েছে বেশ জনপ্রিয়তা।
🪡 বুনন প্রক্রিয়াঃ
মণিপুরীদের শাড়ি বুননের প্রক্রিয়াও অনেকটা আমাদের জামদানি বা দেশী তাঁতের শাড়ির মতো। একটি তাঁতে দু’জন তাঁতি কাজ করেন দুই দিকে বসে। প্রথমে সুতা মাড় দিয়ে শুকানো হয়। তারপর শুকানো সুতা চরকায় পেঁচিয়ে গুঁটিতে ভরে সেখান থেকে মাকুতে নিয়ে বুনতে হয়। সর্বপ্রথম শাড়ির টানা বাঁধতে হয়। তারপর চলে বুননের যত কাজ । একটি শাড়ি বুনতে সময় লাগে আনুমানিক চার থেকে পাঁচ দিন। যদিও শাড়ির রঙ ও নকশার ওপর বুননের সময় নির্ভর করে ।
⚠️ মণিপুরী শাড়ির যত্ন:
১. ভাঁজ করে আলমারিতে রাখা যেকোন শাড়ি কয়েক মাস পর পরই ২৫-৩০মিনিট রোদে দিয়ে ভাঁজ পাল্টে রাখলে শাড়ি অনেকদিন টেকসই হবে।
২. মণিপুরী শাড়িই শুধু না, ব্যবহারের পরে সব ধরনের শাড়ি রোদে ২৫-৩০ মিনিট শুকিয়ে নেয়া উত্তম।
৩. অন্তঃত দুই থেকে তিন বার ব্যবহারের পর শাড়ি ওয়াশ করা উচিত এবং অবশ্যই ওয়াশ করতে পরম যত্ন সহকারে ।
🧺 ওয়াশ প্রক্রিয়াঃ
কোন মতেই অন্যান্য কাপড়ের মত ওয়াশ করা যাবে না। যেহেতু বিশেষ যত্ন সহকারে ওয়াশ করতে হয়, সেহেতু মণিপুরী শাড়ি বাসায় নিজে ওয়াশ করাই শ্রেয়।
১. বাসায় ওয়াশ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই ঠান্ডা পানিতে হালকা ডিটারজেন্ট বা মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে অল্প সময় ভিজিয়ে রেখে ওয়াশ করেতে হবে।
২. অন্য কোন কাপড় শাড়ির সাথে ভেজানো যাবে না। কারণ অন্য কাপড়ের সাথে একত্রে ভেজালে অন্য কাপড়ের রঙ শাড়িতে লেগে যেতে পারে।
৩. শাড়ি ধোয়ার সময়ও অবশ্যই ঠান্ডা পানি ব্যবহার করতে হবে এবং ভালভাবে ধুতে হবে যেন সাবানের ফেনা শাড়িতে লেগে না থাকে।
৪. যেহেতু সুতি শাড়ি সেজন্য আপনাকে মাড় দিয়ে পড়াটাই ভাল। এক্ষেত্রে ভাতের মাড় বা এরারুট ব্যবহার করতে পারেন।
৫. যদি ভাতের মাড় ব্যবহার করেন তাহলে সাথে পরিমাণ মত কাপড়ের নীল মিশিয়ে নেয়াই উত্তম। কারণ তাহলে ভাতের মাড়ের সাদা ছোপ ছোপ দাগ শাড়িতে পড়বে না।
৬. এরারুট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই এরারুটের পরিমাণ পারফেক্ট হতে হবে। যদি পরিমাণ বেশি হয়ে যায়, তাহলে শাড়ি শক্ত হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে শাড়ি ফুলে থাকতে পারে এবং পরতে অসুবিধা হতে পারে।
৭. পানি বা মাড় ঝরানোর জন্য, পানি বা মাড় থেকে শাড়ি আলতো করে চেপে উঠিয়ে একটি স্ট্যান্ডে পানি বা মাড় ঝড়াতে হবে। কোন ভাবেই শাড়ি নিংড়ানো যাবে না।
৮. মাড় দেয়া শাড়ি অবশ্যই খুব ভালোভাবে শুকিয়ে আয়রন করে নিতে হবে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে রোদ যেন অতিরিক্ত কড়া এবং সময়টা যেন অতি দীর্ঘ না হয়। এমনটা হলে শাড়ির রং জ্বলে যেতে পারে।
৯. শাড়ি শুকানোর সময় তারে ঝুলানোর সময় অবশ্যই শাড়ি সমান ভাবে ঝুলাতে হবে যেন শাড়ির পাড়, বডি এবং আঁচল বাঁকা হয়ে না থাকে। নতুবা শাড়ির আকৃতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
১০. ভালভাবে শুকানোর পরে আয়রন করে নিলেই শাড়ীটি পরার জন্য প্রস্তুত। ঘরে বা লন্ড্রিতে যেখানে ইচ্ছা আয়রন করিয়ে নিতে পারেন।