20/08/2022
ধারালো নতুন ব্লেড দিয়ে হাত কেটেছে মাহতা। রক্তে বাথরুমের টাইলস ভেসে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে শেষবার অয়নের কণ্ঠ শোনার তীব্র আকাঙ্খা অনুভব করছে সে। তাই কাঁপা হাতে মেঝেতে পড়ে থাকা ফোনটা তুলে নিল। নাম্বার ডায়েল করতেই সেই অতি পরিচিত প্রিয় কণ্ঠটা বলে উঠল,
"এই, তোকে না কতবার বলেছি হুটহাট ফোন দিবি না? তার পরও এভাবে সময় অসময়ে ফোন দিয়ে জ্বালাতন করিস কেন? আমি কি তোর বাপের চাকর? হ্যাঁ?"
"আমি চলে যাচ্ছি ভাইয়া।" মাহতার গলাটা ধরা।
"যাচ্ছি মানে? কোথায় যাচ্ছিস?"
"যেখানে গেলে কেউ আর ফিরে আসে না। সেখানেই চলে যাচ্ছি। আর কোনোদিন ফিরব না। আজ থেকে তোমাকে ছুটি দিলাম। আজকের পর কেউ আর তোমাকে বেলা অবেলায় ডিস্টার্ব করবে না। তোমাকে জ্বালাবে না। ভালো থেক ভাইয়া। ইউ আর অ্যা ফ্রি বার্ড নাউ।"
"এই তোর ফোন দেওয়ার কারণ? এত রাতে ঘুম ভাঙিয়ে এখন ইমুশনাল কথাবার্তা বলছিস? দেখ, আমার কিন্তু এমনিতেই মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। কাল সকাল আটটায় মিটিং। রাতে ঠিকমতো না ঘুমাতে পারলে মিটিংয়ে বসে ঝিমাতে হবে।"
"বললাম তো ভাইয়া, আজকের পর আর কোনোদিন তোমাকে জ্বালাব না। শুধু আজ শেষবার তোমার কণ্ঠ শুনতে ইচ্ছে করছিল। তাই ফোন দিয়েছি।"
"তা কণ্ঠ শোনার পর্ব শেষ তো? এবার ফোন রাখি?"
"না, রেখ না প্লিজ। আমি তোমার কণ্ঠ শুনতে শুনতে মরতে চাই। তুমি বলো, কথা বলো আমার সাথে।"
"এক চড় মারব বজ্জাত মেয়ে কোথাকার! তুই মরবি, না? মরা কি অতোই সোজা? আরেকবার বলিস, দেখিস কী করি।"
"কী করবে তুমি? মারবে?"
"হ্যাঁ, তা-ই করব। পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলে ফেলব একদম।"
"তা হলে মারো। মারতে মারতে মেরেই ফেল আমাকে। তবুও কথা বলা বন্ধ করো না। এই, ভাইয়া, আমার মাথা ঘুরছে। চোখে ঝাপসা দেখছি। কানের ভেতর ভনভন করছে। এই, আমি আর বসে থাকতে পারছি না। আমাকে তুমি ধরো না! ও ভাইয়া, অয়ন ভাইয়া! ধরো না প্লিজ! এই শেষবার! আমার জীবনের শেষ ইচ্ছে তুমি পূরণ করো। আমাকে তুমি একবার জড়িয়ে ধরো। ধরো না ভাইয়া!"
"জড়িয়ে ধরব? ফোনের মাঝে? এই, তুই কি নেশাপানি কিছু করেছিস নাকি? ফোনে জড়িয়ে ধরব কীভাবে? আর তোকে আমি জড়িয়ে ধরবই বা কেন? আমার কি জড়িয়ে ধরার মানুষের অভাব আছে?"
কথাটা তিরেন মতো বিঁধল মাহতার বুকে। সে লম্বা শ্বাস টেনে বলল, "এরচে' তুমি আমাকে মেরেই ফেলতে!"
"হ্যাঁ, তোকে মারি তারপর জেলে যাই! অতো শখ নেই আমার। তুই বরং কী যে বলছিলি? সুইসাইড? হ্যাঁ, হাত কেটেছিস। এবার সত্যি সত্যি কেটে ফেল। মরে যা।"
মাহতা মৃদু হাসে, "কেটেছি ভাইয়া। সত্যিই কেটেছি। আমার হাতে আর বেশি সময় নেই। একটু পরেই আমি হারিয়ে যাব। আর কোনোদিন আমাকে ফিরে পাবে না। কোনোদিন না।"
"এক চড় মারব! বেয়াদব! ফোন রাখ! যত্তসব ফালতু মেয়েছেলে!"
"না, প্লিজ! ফোন কাটবে না। আমি কথা বলব তোমার সাথে। শেষ নিঃশ্বাস অবধি। তারপর তোমার ছুটি। চিরদিনের ছুটি।"
"এসব ফালতু কথা শোনার টাইম নাই।" বলে ফোন রেখে দিলো অয়ন। মাহতা ফোনটা নামিয়ে রেখে হুহু করে কেঁদে উঠল। চোখ মুছে আবারো অয়নের নাম্বার ডায়েল করল।
"আবার ফোন দিয়েছিস! এই, তোর কাজকাম নেই বলে সবাইকে তোর মতো ভাবিস নাকি? বারবার মানা করার পরও আবার ফোন দিলি কেন?"
"আজ আমার জন্মদিন ছিল ভাইয়া।"
"তো? আমি কী করব?"
"কাল এত করে বললাম, ২৮শে নভেম্বর আমার জন্মদিন। আমার জন্য একটা ফুল নিয়ে এসো। তুমি এলে না। আমি আজ সারাদিন তোমার অপেক্ষা করেছি। তুমি আসোনি। এখন বলছো আমার জন্মদিনে তুমি কী করবে। কাউকে এতটা অবহেলা করা কি ঠিক?"
"কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক সেটা এখন তোর কাছ থেকে শিখতে হবে?"
"না। আমিই পাগল। মনে যা আসে সব তোমাকে বলে বেড়াই। আ'ম স্যরি। আর কোনোদিন তোমাকে জন্মদিনের উইশ করতে বলব না।"
"বহুত উপকার হইলো! এখন রাখি?"
"না।"
অনেক্ষণ চুপচাপ কানের কাছে ফোন ধরে রাখে দু'জন। একসময় মাহতা জিজ্ঞেস করে, "ঘুমিয়ে পড়েছ ভাইয়া?"
"নাহ্! সেই কপাল কি আমার আছে? তোর মতো কুফা ছাত্রী যার কপালে থাকে সে আবার ঘুমাতে পারে নাকি!"
"পুরনো কথা বারবার তুলো কেন ভাইয়া?"
"ভুলতে পারি না যে! তাইতো তুলি। তোর বাবা যেদিন ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তোদের বাসা থেকে বের করে দিয়েছিল, সেদিন খুব ইগোতে লেগেছিল রে! কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম। শহরে আসার পর থাকা খাওয়া সব তোকে পড়িয়ে যা পেতাম তাই দিয়ে পুষিয়ে নিতে হত। সেদিন টিউশানিটা হাতছাড়া হওয়ার পর দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। রাতে আবারো গিয়েছিলাম তোর বাবার কাছে মাফ চাইতে। সে আমাকে সবার সামনে জুতাপেটা করে তাড়িয়ে দিলো। আচ্ছা, তুইই বল, সেদিন কি আমি কোনো দোষ করেছিলাম? তুই যে আমাকে ঘুম পাড়ানোর ওষুধ খাইয়ে এতকিছু করেছিস আবার ছবিও তুলে রেখেছিস তা কি আমি জানতাম রে?"
"সব আমার ভুল। তাইতো এতটা বছর ধরে শাস্তি পাচ্ছি। সহ্য করছি অসহ্য যন্ত্রণা। সেটা কি তুমি বুঝো না অয়ন ভাইয়া?"
"এখন আমি কোনোকিছুই বুঝি না।"
"কিন্তু আমি যে বুঝি! আমি যে একটা মানুষের জন্য তীব্র টান অনুভব করি! আমি যে একটা মানুষের মুখে আমার নাম শোনার জন্য আজ এতটা বছর ধরে অপেক্ষা করি! আমি যে মন থেকে একটা মানুষকে ভালোবাসি! মানুষটাকে যে আর পাওয়া হলো না অয়ন ভাইয়া! আমি যে হেরেই গেলাম তোমার কাছে!"
"তোর কথা শেষ?"
"না ভাইয়া। আমি ফুরিয়ে যাব তোমার সাথে কথা ফুরাবে না।"
ফোন রেখে দিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে নেয় অয়ন। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে হাতের কাছে ফেলে রাখা ফোনটা কাঁপুনি দিয়ে বেজে উঠে। অয়ন তীব্র বিরক্তি নিয়ে স্মার্টফোনের দিকে তাকায়। মাহতা কল দিচ্ছে। ভিডিও কল। অয়ন অবাক হয়। মাহতা তো কখনোই ভিডিও কল দেয় না! আজ হঠাৎ!
তাচ্ছিল্য করে আবার বালিশের ভেতর মুখ গুঁজে নেয় অয়ন। হঠাৎ তার মাথায় আসে, মাহতা সত্যি সত্যি হাত কাটেনি তো! তখনও ফোন বাজছে। অয়ন এক লাফে উঠে বসে। তারপর...
চলবে...
গল্পঃ রঙিন ঘুড়ি
পর্ব ০১
লেখাঃjihad