08/09/2023
ইসলাম আল্লাহতায়ালার মনোনীত চিরন্তন ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা ও নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। সেই শিক্ষা ও বিধান যখন আমরা ভুলে যাই, তখনই আমাদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসে। আখেরাতের ভয়াবহ শাস্তি তো আছেই, দুনিয়ার জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে যায়। ইসলামে সব শ্রেণির মানুষের অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অনুরূপভাবে নারীর সম্মান, মর্যাদা, তাদের সব অধিকারের স্বীকৃতি ও সুরক্ষা প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের কিছু বিধান রয়েছে। ইসলাম যতগুলো বিধান তাদের ওপর আরোপ করেছে এরমধ্যে হিজাব বা পর্দা পালনের বিধান অন্যতম। মূলত ‘হিজাব বা পর্দা’ নারীর সৌন্দর্য ও মর্যাদার প্রতীক। নারীদের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার অতি সহজ ও কার্যকর উপায়। ইসলাম পর্দা পালনের যে বিধান আরোপ করেছে, তা মূলত অশ্লীলতা ও ব্যভিচার নিরসনের লক্ষ্যে এবং সামাজিক অনিষ্টতা ও ফেতনা-ফ্যাসাদ থেকে বাঁচার নিমিত্তেই করেছে। নারীদের প্রতি কোনো ধরনের অবিচার কিংবা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য করেনি। বরং তাদের পবিত্রতা রক্ষার্থেই তাদের ওপর এ বিধানের পূর্ণ অনুসরণ অপরিহার্য করা হয়েছে। এজন্য পর্দার বিধান ইসলামি শরিয়তের পক্ষ থেকে সাধারণভাবে সমাজব্যবস্থার এবং বিশেষভাবে উম্মতের নারীদের জন্য অনেক বড় অনুগ্রহ। এ বিধান মূলত ইসলামি শরিয়তের পূর্ণাঙ্গতা ও যথার্থতার সর্বোত্তম দলিল।
‘পর্দা’ শব্দটি মূলত ফার্সি। যার আরবি প্রতিশব্দ ‘হিজাব’। পর্দা বা হিজাবের বাংলা অর্থ আবৃত করা, ঢেকে রাখা, আবরণ, আচ্ছাদন, বস্ত্রাদি দ্বারা সৌন্দর্য ঢেকে নেওয়া, আবৃত করা ইত্যাদি। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, নারী-পুরুষ উভয়ের চারিত্রিক পবিত্রতা অর্জনের নিমিত্তে উভয়ের মাঝে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত যে আড়াল বা আবরণ রয়েছে তাকে পর্দা বলা হয়। মূলত হিজাব বা পর্দা অর্থ শুধু পোশাকের আবরণই নয়, বরং সামগ্রিক একটি সমাজব্যবস্থা, যেটা নারী-পুরুষের মধ্যে ইসলামি ধ্যান-ধারণা, ইসলামি মানসিকতা সৃষ্টি করে।
পর্দা ইসলামের সার্বক্ষণিক পালনীয় অপরিহার্য বিধান। কোরআন-সুন্নাহর অকাট্য দলিল প্রমাণাদির ভিত্তিতে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি বিধানাবলির যেমন ফরজ; তেমনি পর্দাও সুস্পষ্ট একটি ফরজ বিধান। আল্লাহতায়ালাই নারী জাতিকে সুরক্ষিত ও নিরাপদে রাখার জন্য এই বিধান দিয়েছেন। এ বিধানকে হালকা মনে করা কিংবা এ বিধানকে অমান্য করার কোনো অবকাশ নেই। পর্দার গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের আর মুমিনদের নারীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয় (যখন তারা বাড়ির বাইরে যায়), এতে তাদের চেনা সহজতর হবে এবং তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না’ (সুরা আহজাব : ৫৯)।
এ আয়াতে পর্দার সঙ্গে চলাফেরা করার গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। পর্দা ধরন করে চলাফেরা করলে সবাই বুঝতে পারবে তারা মর্যাদাবান নারী। ফলে পর্দাশীল নারীদের কেউ উত্ত্যক্ত করার সাহস করবে না। প্রকৃতপক্ষে যারা পর্দাহীনভাবে চলাফেরা করে; অধিকাংশ সময় তারাই ইভটিজিং ও ধর্ষণসহ নানা রকমের নির্যাতনের সম্মুখীন হয় এবং রাস্তাঘাটে তারাই বেশি ঝামেলার শিকার হয়। নারীর ইজ্জত রক্ষার্থে পর্দার বিধান অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। প্রকৃত অর্থে তাকওয়া সম্পন্ন বা মুত্তাকি হলো ওই ব্যক্তি যে আল্লাহর নির্দেশগুলো মেনে চলে। আর সর্বসম্মতিক্রমে পর্দা আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ। যেহেতু পর্দা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য অবশ্য পালনীয় নির্দেশ; সেহেতু পর্দা পালনের মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন হতে পারে। এ ছাড়া পর্দা-বিধান সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, এ বিধানের পূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের নৈতিক চরিত্রের হেফাজত হয়।
মূলত পর্দাহীনতার কারণে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা, অপকর্ম ও ব্যভিচারের মতো নিকৃষ্ট পাপের সূচনা হয়। যার কারণে ইভটিজিং, ধর্ষণ ও যৌনসন্ত্রাস প্রকট আকার ধারণ করে। ফলে নানা অঘটনসহ ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন বিপর্যস্ত হয়। যার বাস্তব চিত্র নিত্যদিনের সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে। এ ছাড়া পর্দাহীনতার কারণে পরকীয়া ও চরিত্রহীনতার মতো ঘৃণিত কর্মের সূত্রপাত হয়। যার ফলে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস উঠে যায়। এতে পরিবারে অশান্তি ও বিপর্যয় নেমে আসে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সুসভ্য ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী নারী কিছুতেই পর্দাহীন হতে পারে না। এ ছাড়া পর্দাহীনতার কারণে আল্লাহর বিধানকে অমান্য করা হয়। আর এ অবাধ্যতার কারণে আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। তাই মুমিন নারীদের উচিত গৃহাভ্যন্তরে এমনভাবে অবস্থান করা; যাতে আত্মীয় বা অনাত্মীয় কোনো গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষের দৃষ্টিতে সে না পড়ে। আর এভাবে গৃহে অবস্থান করার মাধ্যমেই পর্দার যথার্থতা অর্জিত হয়।
কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সর্বসম্মতিক্রমে হিজাব বা পর্দা আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নারী জাতির জন্য এক ফরজ বিধান। সর্বাবস্থায় এ বিধানের প্রতি সম্মান দেখানো ও তা অনুসরণ করা অপরিহার্য। মানবসমাজকে পবিত্র ও অপরাধমুক্ত রাখতে পর্দা বিধান এক অভাবনীয় ভূমিকা রাখে। বর্তমান সমাজের যুবক ও তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা এবং নারী জাতির নিরাপত্তার জন্য পর্দা বিধানের পূর্ণ অনুসরণ এখন সময়ের দাবি। সম্প্রতি নারী নির্যাতন খুব বেড়ে গেছে, বিশেষত উঠতি বয়সি মেয়েরা চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার। এমন পরিস্থিতিতে মা-বোনদের গভীরভাবে ভাবতে হবে নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে। তাদের অনেক বেশি সতর্কতা ও সচেতনতার সঙ্গে চলাফেরা করতে হবে। কোরআন-সুন্নাহর অন্যান্য বিধানের মতোই পর্দার বিধানকে সম্মান করতে হবে। নিজে তা অনুসরণ করতে হবে এবং অপরকে এ বিষয়ে উৎসাহ দিতে হবে। আল্লাহতায়ালা যথাযথভাবে এ বিধান পালনের তওফিক দান করুন। আমিন।
Collected