11/08/2025
জ্ঞান ও বুদ্ধির গল্প
মোহিত কামাল
'জ্ঞান' আর 'বুদ্ধি' হেঁটে যাচ্ছিল পাশাপাশি।
হঠাৎ জ্ঞান দেখল বুদ্ধির হাঁটার গতি বেড়ে গেছে। ঘাড় সোজা করে মাথা উঁচিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে।
'এত দ্রুত ছুটছো কেন?' প্রশ্ন করল জ্ঞান।
'দ্রুত চলার পেছনে আমার উদ্দেশ্য আছে, উদ্দেশ্যহীন কোনো কাজ করি না আমি।' জবাব দিল বুদ্ধি।
'দ্রুত হাঁটলেই কি উদ্দেশ্য সফল হবে?'
"বোকার মতো প্রশ্ন করছ কেন? 'প্রত্যুৎপন্নমতি' শব্দটার কথা শুনোনি?"
'শুনবো না কেন? অবশ্যই শুনেছি।'
'অর্থ জানো?'
'হ্যাঁ। এর অর্থ হলো উপস্থিত বা তাৎক্ষণিক বুদ্ধির ধার আর যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দ্রুত এবং যথাযথভাবে সমস্যা সমাধান করার মানসিক বা মনের ক্ষমতা।'
'বাহ! ভালোই তো জানো। তো এই শব্দই যে আমার মাথার তাজ তাও নিশ্চয়ই জানো। জেনেশুনে আমাকে ঠেকানোর চেষ্টা করছো কেন? আটকানোর চেষ্টা করছো কেন? প্রশ্ন করছো কেন?'
'প্রশ্ন করার অর্থ তোমার ভেতরের তোমাকে আরো বেশি মজবুত করে দেওয়া। আটকানো না। অতি তাড়াহুড়া করলে অনেক সময় ভুলও হতে পারে।'
'আমার অভিজ্ঞতার আলো আমাকে কখনো ভুল করতে দেয় না।' অহংকারী হয়ে বলল বুদ্ধি।
'অভিজ্ঞতার আলোটা কী, জানো?' বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করল জ্ঞান।
দ্রুত জবাব দিতে গিয়েও আটকে গেল বুদ্ধি।
বুঝে গেছে জবাব দিলে জ্ঞান জয়ী হয়ে যাবে। অভিজ্ঞতা যে জ্ঞানের স্বর্ণমুকুট, জানে সে। তাই জয়ী হওয়ার মানসে দ্রুত প্রতিপক্ষের দোষ ধরে বলতে লাগল, 'তোমার চিন্তা তো ধীরে বহে মেঘনার মতো। তোমার সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগেই তো চারপাশ ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে।'
জ্ঞান চুপ হয়ে গেল। জবাব না দিয়ে ধীরে অতি ধীরে এগোতে লাগল আর দেখতে লাগল বুদ্ধির উদ্যত এগিয়ে যাওয়া।
আচমকা একটা ঘূর্ণি টের পেল উভয়েই । মাটি কেঁপে উঠল। বাতাসের তরঙ্গে দোলা উঠল। ধুলোময় ঘূর্ণি লাটিমের মতো ঘুরতে ঘুরতে রূপ নিল একজোড়া চোখে। ধীরে ধীরে উভয়ের চোখে ধরা দিল জ্যান্ত এক মানুষ। সার্জনরা যে ধরনের ড্রেস পরে অপারেশন থিয়েটারে অপারেশন করে থাকেন, সেরকম ড্রেস পরনের একজনকে দেখে হতবিহবল হয়ে গেল বুদ্ধি আর নির্লিপ্ত নয়নে নিজের গভীর চেতনা থেকে চেয়ে রইল জ্ঞান।
'তোমরা দুজনই গুরুত্বপূর্ণ। তবে জ্ঞানীজন চিন্তা করেন ধীরে, সিদ্ধান্ত দেন জীবনের গভীরবোধ থেকে, সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে, তাঁরা দার্শনিক হয়ে থাকেন।'
'ও! সে তোমাকে দালাল হিসেবে ধরে নিয়ে এসেছে?'
'দেখো, তুমি সিদ্ধান্ত দাও দ্রুত। সমস্যার সমাধানে দক্ষ। এই দক্ষতার পেছনের রসদ হচ্ছে তোমার অভিজ্ঞতা, তোমার জ্ঞান। সেটাই তুমি ব্যবহার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকো, সমস্যার সমাধান করে থাকো। অনেক সময় আবেগের অনিয়ন্ত্রণ তোমার বুদ্ধির ধার ভোঁতা করে দিতে পারে। যেমনটা ঘটেছে এখন। কারণ জেগে ওঠা ক্রোধ তুমি সামলাতে পারোনি।'
'তুমি কি বলতে চাচ্ছ জ্ঞানের ওপরই আমি নির্ভরশীল?' দাপটের সঙ্গে প্রশ্ন করল বুদ্ধি।
'অবশ্যই। তবে বেপরোয়া আবেগ নিয়ন্ত্রণে রেখে জ্ঞানটাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে আরো বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠব আমরা। তুমি যে বুদ্ধিমান তার পেছনে ছুটে তা প্রমাণ করার জন্য জীবনটা পার করে দিয়ো না। বরং জ্ঞানী হওয়ার পেছনে সময় দাও। বুদ্ধিমানরাও জ্ঞানী হতে পারে। তুমিও পারবে। তবে মনে রাখতে হবে জ্ঞান আর বুদ্ধি এক নয়।'
বুদ্ধির দাপুটে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিশ্চুপ ছিল জ্ঞান। এবার যেন অতল থেকে জেগে উঠে ধীরে ধীরে বলল, 'এমন কথা তো বলে গেছেন একজন মার্কিন নিউরোসার্জন ও লেখক।'
জীবনের ধুলোময় জ্ঞানের ঘুর্নির ভেতর থেকে জেগে ওঠা চোখজোড়া বিনয়ে শীতল হয়ে গেল। তবে কথা থেমে গেল না। বললেন, 'তুমি প্রায় ধরে ফেলেছো আমাকে। নিশ্চিত এখন পুরোটা ধরে ফেলবে।'
'ইয়েস আপনার নাম সঞ্জয় গুপ্ত। ১৯৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন। ৫৬ বছর বয়সী আপনি কেবল বিশ্বের খ্যাতিমান নিউরোসার্জনই নন, বরেণ্য কথাসাহিত্যকও।'
'বাহ। খুশি হলাম নাম জানো দেখে। তো আমার কোনো বই কি পড়েছো, তুমি?'
'শিওর আপনার চারটি বই আছে আমার কালেকশনে। এর মধ্যে Cheating Death আর Monday Morning বই দুটো পড়া হয়েছে। মৃত মানুষ আবার কীভাবে জীবিত হয়ে ওঠে তার গা শিরশির করা বর্ণনা আছে প্রথমটাতে। আর দ্বিতীয়টি হলো আপনার সাড়া জাগানো উপন্যাস-- নিউরোসার্জনদের জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতায় নির্মিত সৃজনশীল আখ্যান, পড়ে মুগ্ধ হয়েছি।'
'দেখলে তো, বুদ্ধি। জ্ঞান তার গভীরতার ভেতর কীভাবে আলো জ্বালিয়ে রেখেছে? সে-আলোর তরঙ্গ বেয়ে কেন আলোর গতির চেয়ে দ্রুত গতিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমি এসে হাজির হয়েছি তোমাদের সামনে, বুঝতে পেরেছো?'
দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমস্যা সমাধানের শিরোস্ত্রাণ থেকে আলো বেরিয়ে এলো। মাথা দুলিয়ে বুদ্ধি জবাব দিল, 'পেরেছি। তোমাকে ধন্যবাদ।'
ধানমন্ডি
০৮.০৮.২০২৫