15/06/2026
কাশফিয়া আমিনা নামে একজন ইনফ্লুয়েনসার গত কয়দিন ধরে ভীষণ সমালোচিত।
তার লাইভটা আমি দেখতে পাইনি। কিন্তু তিনি নাকি সেখানে খুবই বাজে একটা টার্ম ইউজ করেছেন ভাইয়ের সাথে বোনের সম্পর্ক নিয়ে।
ভাইকে বোনের "ইমোশনাল হাজবেন্ড" বলেছেন শুনেছি।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কাশফিয়া আমিনাকে পছন্দ করি না।
কেন করি না সেই বক্তব্য থাক।
আমার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দে কারো কিছু আসে যায় না।
কিন্তু আমি এই টার্মটা নিয়ে একটু কথা বলতে চাই।
আমার কেন যেন মনে হয়েছে উনি যা বলতে চেয়েছেন সেটা আসলে বুঝিয়ে বলতে পারেননি।
এই টার্মটা কিন্তু দারুণ ইন্টারেস্টিং এবং অনেক কিছু জানার এবং বোঝার আছে।
কেন বোঝার আছে জানেন??
বাংলাদেশের অসংখ্য নারী এই বিষয়টার শিকার।
অসংখ্য মানে অসংখ্য ।
কেন আপনি দেখেননি কখনো,
আপনার হাসবেন্ড সারাদিন পরে বাসায় এসে সরাসরি আপনার শাশুড়ির রুমে ঢুকে যায় মা কেমন আছে জানার জন্য এবং মার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে তারপর আপনার রুমে আসে?
এই জিনিসটা নিয়ে আপনি কখনো ভেবেছেন?
না এটা খারাপ কিছু না।
আমাদের বাংলাদেশের মতো দেশে এটা অবশ্যই খুব পজিটিভলি দেখা হয়।
মা ভক্ত ছেলে মনে করা হয়।
শুধু তাই নয়, আমার একজন আত্মীয়ের কথা বলি।
মা ছেলের দারুণ বন্ডিং।
বাইরে থেকে দেখে মা ভক্তই মনে হবে।
কিন্তু তার ওয়াইফের বক্তব্য হচ্ছে, ছেলের মন খারাপ হলে, ছেলে মেন্টালি আপসেট থাকলে, ছেলের কিছু খেতে ইচ্ছে করলে,
ছেলে তার ওয়াইফের কাছে না গিয়ে তার মায়ের কাছে যায়। তার সব ধরনের ইমোশনাল সাপোর্ট সে তার মায়ের কাছ থেকে নেয়।
কলম: Manira Sultana Papri.
তার সংসারে কি হবে না হবে, সংসারের ভবিষ্যৎ প্ল্যান সে সব তার মায়ের সাথে করে।
ওয়াইফের সাথে না।
হাজব্যান্ড ওয়াইফ মিলে হানিমুনে কোথায় যাবে মা ঠিক করে দেয়। আজকে ঘরে রান্না কি হবে মা ঠিক করে।
ওয়াইফকে কি শাড়ি
কিনে দেবে ঈদে সেটাও মা ফিক্স করে দেয়।
ভুলেও যদি সে তার ওয়াইফের জন্য কিছু কেনে তার মা প্রশ্ন করে আমার শাড়ি কই?
অস্বাস্থ্যকর কোন খাবার যদি ছেলেটা খেতে চায়,
তার ওয়াইফ মানা করে। কিন্তু মা বলে আহা থাক না আমার ছেলেটা।
তুমি শুধু ওর খাওয়ার মধ্যে টোকাটুকি কর।
একটু খেতেই তো চায়।
ছেলে তখন বলে, দেখেছো আমার মা বোঝে আমার কি লাগবে। তুমি বোঝ না।
ওয়াইফের তখন মনে হয় আসলে তার এই ছেলের সাথে কোন সম্পর্কেই নাই।
একজন লাইফ পার্টনার হিসেবে যেসব বিষয়ে তার ওয়াইফের সাথে তার শেয়ার করার কথা সেগুলো সে তার মায়ের সাথে করছে।
ওয়াইফের নিজেকে মা ছেলের মধ্যে কাবাব মে হাড্ডি মনে হয়।
ওয়াইফ নিজের কোন ভূমিকাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না আর।
ছেলেটার লাইফে তার ওয়াইফ কোন জায়গাই পায়না।
এমনকি ওয়াইফের সাথে ঝগড়া হলেও ছেলে গিয়ে সব কিছু বলে দেয় তার মাকে কি কি নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া হলো। মায়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
মা তাকে সান্ত্বনা দেয়।
এমনকি দুজনের একান্ত ব্যক্তিগত আলাপ সেগুলোও ছেলে গিয়ে তার মাকে বলে দেয়।
এবং পরবর্তীতে সেই মা এইসব বিষয় নিয়ে ছেলের বউকে খোঁচাখুঁচি করে এবং অপমান করে।
এবার বলেন এই সম্পর্কটা কিংবা এই অভ্যাসগুলো কি হেলদি অভ্যাস??
এই কাজটাই যদি কোন নারী তার বাবা বা ভাইয়ের সাথে করে তাহলে কি সমাজ মেনে নেবে??
আপনারা ফেইস করেননি কখনো এরকম??
এমনটা যে শুধু মায়েরা করে তা না।
এমনটা অনেক সময় বোনেরাও করে।
এবার বলুন আপনারা কেউ কি এই ধরনের সিচুয়েশনে পড়েননি??
যদি পড়ে থাকেন তাহলে এটা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত কিনা??
এর মানে এই না যে মায়ের সাথে সন্তানের বা বোনের সাথে ভাইয়ের কোন খারাপ সম্পর্ক আছে।
কিন্তু ইমোশনালি তারা একে অন্যের প্রতি ভীষণভাবে ইনভলভড এবং ডিপেন্ডেড যে সম্পর্কের হেলদি বাউন্ডারিটা তারা ক্রস করে যায়।
কিংবা প্রত্যেকটা সম্পর্কের একটা রোল থাকে সেই রোলটা তারা ভুলে যায়, কিংবা অন্য একটা রোল প্লে করা শুরু করে।
যে সিদ্ধান্তটা ঘরের বউয়ের নেয়ার কথা, যে তথ্যটা ঘরের বউয়ের আগে জানার কথা,
সেই তথ্যটা আগে ছেলের মা বা ছেলের বোন জানতে পারে।
সেই অর্থে "ইমোশনাল হাজব্যান্ড" টার্মটার ব্যবহার হয়।
এই ধরনের অসংখ্য ঘটনা ঘটে বলেই
সমাজে এগুলো নিয়ে কথা হয়, এই টার্ম গুলো কয়েন আউট হয়।
আমি একটা ভিডিও কমেন্ট সেকশনে দিয়ে দেব, আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে।
এটাকে হিউম্যান সাইকোলজির ভাষায় ইডিপাস কম্পলেক্সও বলা হয়।
ইডিপাসের গল্পটা জানেন??
ইডিপাস তার বাবাকে হত্যা করে তার মাকে বিয়ে করেছিল।
ইডি পাস' (Oedipus) মূলত প্রাচীন গ্রিক পুরাণের (Greek Mythology) একটি কালজয়ী চরিত্র ও ট্র্যাজেডি।তিনি থিবস (Thebes) শহরের রাজা ছিলেন।
দৈববাণী অনুযায়ী অনিচ্ছাকৃতভাবে নিজের বাবাকে হ ত্যা এবং মাকে বিয়ে করার পর, চরম সত্য জানার পর তিনি নিজের চোখ উপড়ে ফেলেছিলেন—যা গ্রিক সাহিত্যে অমোঘ নিয়তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
পরবর্তীতে
সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Freud) যিনি বিশ্ববিখ্যাত অস্ট্রিয়ান নিউরোলজিস্ট এবং মনোবিশ্লেষণের (Psychoanalysis) জনক।
তিনি এই "ইডিপাস কমপ্লেক্স" টার্মটা Coin out করেন।
যদিও ইডিপাসের গল্পের সাথে এই টার্মটার লিটারালি
কোন মিল নেই।
কিন্তু মেটাফোরিক্যাল কানেকশন আছে।
Freud-এর মতে, শিশুর জীবনের একটি পর্যায়ে মা-বাবাকে ঘিরে জটিল আবেগ তৈরি হতে পারে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান অবশ্য এই ধারণাকে আক্ষরিকভাবে নয়, বরং শিশুর আবেগগত বিকাশের প্রতীক হিসেবে দেখে।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন একটি ছেলে বড় হলেও আবেগগতভাবে পুরোপুরি স্বাধীন হতে পারে না।
বিশেষ করে যখন স্বামী-স্ত্রীর emotional connection দুর্বল হয়ে যায় এবং মা
অজান্তেই নিজের একাকীত্ব, কষ্ট বা অপূর্ণ আবেগগত চাহিদার একটি অংশ ছেলের ওপর স্থানান্তর করতে শুরু করেন।
এটা তো সত্যি আমাদের সমাজের সব স্তরের নারীরাই কমবেশি অবহেলিত এবং অত্যাচারিত।
ছেলের মাও তার স্বামীর কাছ থেকে তার উপযুক্ত সম্মান যত্ন এবং মেন্টাল কেয়ার পায় না।
কিচেনে কখনো হাসবেন্ড তাকে হেল্প করেনি।
কোনদিন তার মনের কোন দুঃখ শোনেনি ঠিকমতো।
তার কোন কথা মানা তো দূরে থাক।
কারণ তার শাশুড়ি সেটা হতে দেয়নি।
তখন সেই মা টা কি করে??
তার যত মেন্টাল Dillema গুলো আছে সেগুলো তার ছেলের সাথে শেয়ার করা শুরু করে।
কারণ ছেলেটা তো তার নিজের সন্তান। ছেলে তো মা'কে ভালবাসে।
মায়ের কথা তো সে অবশ্যই মনোযোগ দিয়ে শুনবে। মায়ের ব্যথা সে অনুভব করবে।
করেও।
আস্তে আস্তে ছেলে বুঝতে পারে সে তার মায়ের কাছে অনেক ইম্পরট্যান্ট।
আস্তে আস্তে ছেলে বুঝতে পারে তার মায়ের মনের অনেক কষ্টের কথা তার মাথার সাথে শেয়ার করে।
সেও নিজেকে বয়সের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করে।
আর এদিকে মাকে কষ্ট দেয় বলে ছেলের বাবার প্রতি এক ধরনের বিদ্বেষ এবং ক্ষোভ তৈরি হয়।
আস্তে আস্তে ছেলের সাথে বাবার দূরত্ব বাড়তে থাকে
আর মায়ের সাথে ছেলের মানসিক ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে।
এর মধ্যে কোন অসংলগ্ন কিছু নেই কিন্তু
মা এবং ছেলে দুজনেরই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এটা ক্ষতিকর কারণ এরা এমনভাবে একজন আরেকজনের উপরে ইমোশনালি ডিপেন্ডেন্ট হয়ে যায় যে
মায়ের যে সব কথা তার হাজবেন্ডের সাথে শেয়ার করার কথা ছিল সেগুলো সে তার ছেলেকে শেয়ার করা শুরু করে।
আর ছেলেটা বড় হতে হতে বয়স্ক নারীকে যে কথাগুলো তার শেয়ার করার কথা বা তার লাইফ পার্টনারকে যেগুলো শেয়ার করার কথা সেগুলো সে তার মাকে শেয়ার করে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
তখন ছেলে শুধু সন্তান থাকে না। ধীরে ধীরে সে মায়ের emotional support system, closest ally, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে Emotional Husband বা Surrogate Husband-এর ভূমিকায় চলে যায়।
এখানে হাজব্যান্ড বলতে কোন
অশ্লীলতা বা অশ্লীল সম্পর্ক বোঝানো হয়নি।
মেন্টাল ডিপেন্ডেন্স বুঝিয়েছে
মনোবিজ্ঞানীরা।
এই ধারণাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি লিখেছেন মনোবিজ্ঞানী Kenneth M. Adams,চাইলে উনার কিছু বই পড়তে পারেন।
বিষয়টি সম্পূর্ণ আবেগগত। এর মানে কোন রোমান্টিক সম্পর্ক না। এটা একটা নির্ভরশীলতার সম্পর্ক।
যে মানসিক সমর্থন, বোঝাপড়া এবং সঙ্গ একজন স্বামীর কাছ থেকে পাওয়ার কথা ছিল, তার একটি অংশ অজান্তেই ছেলের কাছ থেকে নেওয়া শুরু হয়।
এর ফলে তৈরি হয় Emotional Enmeshment।
ছেলের মনে ধীরে ধীরে একটি বিশ্বাস জন্মায়—"মা কষ্ট পেলে সেটা লাঘব করা শুধু আমারই দায়িত্ব।"
ফলে সে বড় হয়ে নিজের সংসার, স্ত্রী এবং মায়ের মধ্যে আটকে যায়।
বাইরে থেকে তাকে সবাই "মা-ভক্ত ছেলে" বলে প্রশংসা করে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে প্রায়ই guilt, emotional pressure এবং loyalty conflict-এর মধ্যে বাস করে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন ছেলে তার মাকে ভালোবাসবে, সম্মান করবে, খোঁজ নেবে—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু সুস্থ family system-এ মা সম্মানের জায়গায় থাকেন, আর spouse থাকে জীবনের অগ্রাধিকারের জায়গায়।
কারণ একজন মা সন্তানের প্রথম ভালোবাসা হতে পারেন, কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যৎ সংসারের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেন না।
যেখানে love আছে কিন্তু boundary নেই, সেখানে ভালোবাসা ধীরে ধীরে Emotional Enmeshment-এ পরিণত হতে পারে।
আর তখন সম্পর্কগুলো ভালোবাসার চেয়ে বেশি guilt, obligation এবং emotional dependency দিয়ে পরিচালিত হতে শুরু করে।
কাশফিয়া আমিনা হয়তোবা এই ইমোশনাল পার্টনারশিপ এর কথাই বোঝাতে চেয়েছেন তার হাজবেন্ডের সাথে হাজবেন্ডের বোনের।
আর যদি তিনি সেটা নাও বুঝিয়ে থাকেন,
আমি চাই আপনি এই বিষয়টা নিয়ে পড়ুন।
মা হিসেবে এই বিষয়টা নিয়ে সচেতন হোন।
ওয়াইফ হিসেবে এই বিষয়টা নিয়ে সচেতন হোন।
তাহলে হয়তো বা প্রত্যেকটা সম্পর্ক হেলদি বাউন্ডারিতে থাকবে।
ছেলের বউ এবং শাশুড়ি একে অন্যকে সতীনের মত
মনে করবে না।
আর ছেলেটাও মা আর বউয়ের মাঝখানে স্যান্ডউইচ হয়ে যাবে না।
আমাদের সমাজের সব কিছু একটা আবেগের ভেতর দিয়ে চালিত হয় বলে আমরা যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারি না আর পড়াশোনা করতে তো আমরা ইন্টারেস্টটেড নই।
এ কারণে আমাদের সামাজিক কুসংস্কার এবং
অস্বাভাবিক বিষয়গুলোকে খুব স্বাভাবিক ভাবে চালিয়ে দেয়া হয়।
এতে করে ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য সংসার,
দিনশেষে নারীরা ভুগছে, কাঁদছে।
তাই পড়ুন জানুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন।
জানার কোন বিকল্প নেই।
তবে শেষ বেলায় জানতে চাই থেকে এই ধরনের সিচুয়েশন কখনো হয়নি??
এই ঘটনা কি ঘটনা আমাদের সমাজে?
( পোস্ট শেয়ার করতে পারেন কিন্তু কপি করবেন না!)