24/06/2026
আমার এক বান্ধবী আছে। আমি যেদিন প্রথম মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলাম, ঠিক সেদিনই সে-ও আবাসিকে এসেছিল। আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তখন কে জানত, এই মেয়েটাই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের একজন হয়ে উঠবে!
দিন যেতে লাগল। আমরা একসাথে পড়াশোনা করতাম, একসাথে বড় হতে লাগলাম। প্রায় আড়াই-তিন বছর এভাবেই কেটে গেল। তারপর হঠাৎ একদিন সে আর মাদ্রাসায় এলো না। কেন এলো না, কোথায় গেল—কিছুই জানতে পারলাম না। তখন তো আর এখনকার মতো মোবাইল ফোন বা যোগাযোগের এত সুযোগ ছিল না। তাই খোঁজ নেওয়ার কোনো উপায়ও ছিল না।
এরপর সময় তার নিজের গতিতে চলতে থাকল। একসময় আমাদের মাদ্রাসা অন্য জায়গায় চলে গেল, যা আমার বাড়ি থেকে অনেক দূরে হয়ে যায়। তাই আব্বু আমাকে অন্য একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিলেন।
নতুন মাদ্রাসায় প্রথম দিন যাওয়ার কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে।
আশুরার ছুটিতে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম।
ছুটির পরে ক্লাস শুরু হয়েছিল যেদিন,সেদিন যাই মাদ্রাসায়। আমাদের ক্লাসের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি—কাউকে চিনি না, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, ভেতরে ভীষণ ভয় আর অস্বস্তি কাজ করছে। ঠিক তখনই হঠাৎ একটা মেয়ে দৌড়ে এসে ডাকতে লাগল, “রাকিবা! রাকিবা!”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি—সে আমার সেই হারিয়ে যাওয়া বান্ধবী!
সেদিনের সেই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মনে হয়েছিল, আল্লাহ যেন নতুন জায়গার ভয় দূর করার জন্য আমার সবচেয়ে আপন মানুষটাকেই আবার ফিরিয়ে দিয়েছেন।
এরপর আবার আমরা একসাথে পড়াশোনা শেষ করলাম। তারপর সবার আগে আমার বিয়ে হয়ে গেল। আমাদের দুই পরিবারেরও বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা তাদের বাসায় গেছি, তারাও আমাদের বাসায় এসেছে।
কিন্তু বিয়ের পর আজ প্রায় সতেরো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। অথচ এখন পর্যন্ত আর একদিনও তার সঙ্গে দেখা হয়নি।
চাইলেই দেখা করা যায়। আম্মুর বাসায় গেলে তাদের বাসা খুব বেশি দূরে নয়, অটোতে মাত্র ৪০/৫০ মিনিটের পথ। একটু সময় বের করলেই হয়তো দুই-তিন ঘণ্টা, কিংবা একটা দিনের জন্য দেখা করে আসা সম্ভব। কিন্তু সংসার, সন্তান, দায়িত্ব—এসবের ভিড়ে সেই সময়টুকু আর বের করা হয়ে ওঠে না।
সে অ্যান্ড্রয়েড ফোনও ব্যবহার করে না। তাই শুধু দেখা নয়, ১৮ বছর ধরে আমরা একে অপরকে ভিডিও হলেও দেখি নি। তার তিনটি মেয়ে হয়েছে—আজ পর্যন্ত তাদের কাউকেও দেখার সৌভাগ্য হয়নি।
তবুও মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হয়, হঠাৎ একদিন দরজায় গিয়ে দাঁড়াই। সেও বলে,তুমি শিডিউল করে আসতে পারবা না। হুট করে চলে এসে চমকে দিবা।
তখন হয়তো সে আবার আগের মতোই অবাক হয়ে বলবে, “রাকিবা!”
মেয়েদের বন্ধুত্ব বোধহয় এমনই। ভালোবাসা কমে না, দূরত্ব বাড়ে না, শুধু সময় আর দায়িত্বের ভিড়ে দেখা করাটা আর হয়ে ওঠে না।