08/08/2026
চাচা শ্বশুরকে নাস্তা খাওয়াতে গিয়ে... যা কাণ্ড ঘটেছিল! 😄
জীবনে কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলো যত পুরোনো হয়, ততই মিষ্টি লাগে। তখন যেগুলো ভীষণ টেনশনের ছিল, আজ সেগুলোই মনে পড়লে অজান্তেই মুখে হাসি চলে আসে। আমার নতুন সংসারের সময়ের এরকম একটা স্মৃতি আছে...
বিয়ের পরের প্রথম বছর। তখন আমার হাসব্যান্ডের অফিস ছিল নারায়ণগঞ্জে, আর আমরা থাকতাম ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারে। নতুন সংসার, নতুন দায়িত্ব, নতুন পরিবেশ—সবকিছুই তখন শিখছি। আমি তখন একেবারেই নতুন রাঁধুনি। বাসায় কেউ আসবে শুনলেই মনে হতো, এবার বুঝি আমার পরীক্ষা!
একদিন হঠাৎ আমার চাচা শ্বশুর ফোন করে বললেন,
— "মা, আমি তো তোমাদের বাসায় আসতেছি।"
শুনেই আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এখন আমি কি রান্না করবো এই টেনশনে!কী করবো কিছুই মাথায় আসছিল না। তাড়াতাড়ি আমার হাসব্যান্ডকে ফোন করে বললাম,
— "চাচা আসতেছেন! আমি কী কী রান্না করব?"
এর কিছুক্ষণ পর আবার চাচার ফোন।
হেসে বললেন,
— "আরে মা, এমনি একটু মজা করলাম। আজ না, কাল আসব।"
তখন যেন বুক থেকে একটা বড় পাথর নেমে গেল। মনে হলো, আলহামদুলিল্লাহ! অন্তত একদিন সময় তো পেলাম।
সেদিন সন্ধ্যায় আমার হাসব্যান্ড অফিস থেকে বাসায় ফিরতেই আমরা দুজন খাতা-কলম নিয়ে বসে গেলাম। কী রান্না হবে, কখন কী করব, সকালের জন্য কী, দুপুরের জন্য কী—একেবারে তালিকা বানিয়ে ফেললাম।
এখন মনে হলে খুব হাসি পায়। কিন্তু তখন আমার অবস্থা একেবারে অন্যরকম ছিল। মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা দিতে যাচ্ছি! টেনশনে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। বারবার শুধু একটা কথাই মাথায় ঘুরছিল—চাচার যেন কোনো অযত্ন না হয়, উনাকে যেন মন ভরে আপ্যায়ন করতে পারি।
পরদিন সকাল থেকেই রান্না শুরু করে দিলাম। অনেক কিছু রান্না করলাম। ভাবলাম, চাচার জন্য নিজের হাতে কুশলি পিঠাও বানাব। আলু দিয়ে বানানো এই পিঠাটা আমাদের এলাকায় খুব জনপ্রিয়।
চাচা বাসায় এলেন। আমি তখনও রান্নার ব্যস্ততায় গোসল শেষ করতে পারিনি। উনি ঘরে ঢুকেই বললেন,
— "মা, তুমি আগে গোসল সেরে আসো। তারপর আমরা একসাথে খাব।"
কথাটা শুনে কী যে ভালো লেগেছিল! মনে হয়েছিল, উনি যেন একদম নিজের মেয়ের সঙ্গেই কথা বলছেন।
খাওয়ার সময় চাচাকে কুশলি পিঠা দিলাম। উনি একটার পর একটা খাচ্ছেন আর বলছেন,
— "মা, খুব টেস্ট হয়েছে! খুব টেস্ট হয়েছে!"
আমি তো মনে মনে ভীষণ খুশি। নতুন রাঁধুনি হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রশংসা আর কী হতে পারে!
খাওয়া শেষ করে চাচা বললেন,
— "মা, তুমি একটা পিঠা খাও। আমার এখান থেকে নাও, নিয়ে খাও।"
আমি একটা পিঠা তুলে মুখে দিতেই তো অবাক!
লবণই দিইনি!
আমি হেসে বললাম,
— "চাচা! এতে তো লবণই হয়নি। আপনি এতক্ষণ বললেন খুব টেস্ট!"
চাচা হো হো করে হেসে উঠলেন।
তারপর বললেন,
— "তোমার চাচিও প্রথম প্রথম এমনই রান্না করত। এখন দেখো, কী সুন্দর রান্না করে! আস্তে আস্তে সব শিখে যাবে মা।"
সেদিন কথাটা শুনে মনে হয়েছিল, নতুন কিছু শিখতে গিয়ে ভুল হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। আর সেই ভুলে কেউ যদি হাসাহাসি না করে, বরং ভালোবেসে সাহস দেয়—তাহলে শেখার পথটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
কিন্তু আসল কাহিনী তো হলো পরের দিন সকালে।
খুব ভোরে দরজায় নক করার শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙল।
ঘুম ভাঙতেই দেখি, চাচা দাঁড়িয়ে আছেন।
হেসে বললেন,
— "মা, আমি এখনই বের হব।"
আমি তো কিছুতেই না খাইয়ে যেতে দেব না।
বললাম,
— "চাচা, একটু বসেন। আমি ঝটপট ভাত বসিয়ে দিচ্ছি।"
তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত চেপে ধরে বললেন,
— "না মা, রান্না করতে হবে না। আমি তোমাদের সঙ্গে একটু গল্প করেই চলে যাব। তুমি যদি রান্নাঘরে চলে যাও, তাহলে গল্প করব কখন?"
তখনও বুঝিনি, উনার "এখনই বের হব" বলাটা শুধু আমাকে কষ্ট না করতে দেওয়ার জন্য। আসলে উনি আরও অনেকক্ষণ আমাদের সঙ্গে বসে গল্প করেছিলেন। উনার ইচ্ছেটাই ছিল আমাদের দুজনের সঙ্গে একটু সময় কাটানো। তাই আমাকে কোনোভাবেই রান্নাঘরে ঢুকতে দিচ্ছিলেন না।
শেষ পর্যন্ত ভাবলাম, ভাত নয়, ঝটপট একটা নাস্তা বানাই।
ফল কাটতে শুরু করলাম। আর মনে পড়ল, ছোটবেলায় আম্মু তাড়াহুড়ো হলে ডিম আর মুড়ি মেখে ছোট ছোট কাটলেটের মতো ভেজে দিতেন। ভাবলাম, সেটাই বানাই।
আমি আমার হাসব্যান্ডকে বললাম,
— "তুমি ডিমগুলো ফাটাও।"
দুজনেরই তখন চোখে ঘুম।ব্রাশও করা হয়নি, হাত-মুখ ধোয়ারও সময় পাইনি। ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো করে নাস্তা বানাতে নেমে পড়েছি। মাথায় তখন একটাই চিন্তা—চাচাকে কিছু না খাইয়ে যেতে দিবো না।
আমার হাসব্যান্ড ফ্রিজ থেকে একটা ডিম নিয়ে টেবিলে ঠুকল।
একবার...
দুইবার...
তিনবার...
কিন্তু ডিম আর ফাটে না!
আবার একটু জোরে মারল।
তবুও না!
ওর মুখটা একেবারে শুকিয়ে গেল।
বলল,
— "দেখো তো! ডিমটা ভাঙছে না কেন?"
আমি গিয়ে নিজেও চেষ্টা করলাম।
আমিও জোরে বাড়ি দিচ্ছি। কিন্তু ডিমটা শুধু একটু চ্যাপ্টা হচ্ছে, ভাঙছে না।
এবার তো দুজনেরই টেনশন শুরু!
মনে মনে ভাবছি, "আল্লাহ! এটা আবার কেমন ডিম? কাঁচা ডিম ভাঙছে না কেন? এত জোরে বাড়ি দিচ্ছি, তবুও ফাটছে না! এটা কি ভূতুরে ডিম নাকি?"
টেনশনে আমাদের দুজনের মুখই শুকিয়ে গেছে।
হঠাৎ করেই আমার মনে পড়ল...
আরে! আগের দিন তো আমি একটা সিদ্ধ ডিম ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলাম!
মানে, কাঁচা ডিম ভেবে আমার হাসব্যান্ড সেই সিদ্ধ ডিমটাই ভাঙার চেষ্টা করছিল!
এক সেকেন্ড আমরা দুজন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর এমন হাসি শুরু করলাম যে হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে এসেছিল।
ঘুমের ঘোর, চাচাকে ঝটপট নাস্তা খাওয়ানোর টেনশন—সব মিলিয়ে আমরা এমন বোকা হয়ে গিয়েছিলাম যে সিদ্ধ ডিম আর কাঁচা ডিমের পার্থক্যটাই মাথায় ছিল না!
এরপর ঠিকঠাক নাস্তা বানিয়ে চাচাকে খাওয়ালাম। উনি অনেকক্ষণ আমাদের সঙ্গে গল্প করলেন।
যাওয়ার সময় আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন,
— "মা, এটা রাখো। নিজের জন্য কিছু কিনে নিও।"
মনে আছে, সেই টাকা দিয়ে আমি কয়েকটা প্লেট কিনেছিলাম।
আজও এই ঘটনাটা মনে পড়লে আমার খুব হাসি পায়। তখন যে ঘটনাগুলোতে টেনশনে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যেত, আজ সেগুলোই মনে পড়লে হাসি পায়।
কিছু স্মৃতি কেন এত আপন হয়ে যায়, সেটা হয়তো বলে বোঝানো যায় না। শুধু মনে পড়লেই মনটা ভালো হয়ে যায়।
আলহামদুলিল্লাহ, "কী সুন্দর একটা সময় ছিল!"
🖋️ Rukaiya Sultana Monira