04/07/2026
স্ক্রিন আসক্তি ও গণিতে দুর্বলতা:
আজকাল অনেকেই কি খেয়াল করছেন আপনার স্কুল পড়ুয়া সন্তান অংক করতে বসলে খুব দ্রুত ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে? ছোট ছোট হিসেব করতে গিয়েও ভুল করছে কিংবা গণিতের নাম শুনলেই তার মধ্যে এক ধরণের ভয় কাজ করছে? আমরা অনেকেই ভাবি এটি হয়তো গণিতে তার সাধারণ অনীহা। কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে সেটি হতেই পারে। তাদের বুদ্ধিমত্তা অন্য কিছুর মাধ্যমে বেশি বিকশিত হয় গানিতিক নিয়মের চেয়ে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা (যেমন: JAMA Network-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষা) বলছে এ যুগে এর পেছনে একটি বড় কারণ হতে পারে—অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম বা স্ক্রিন আসক্তি (Screen Addiction)!
সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশব ও কৈশোরে প্রতিদিন মাত্র ১ ঘণ্টা অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলেও বাচ্চাদের স্ট্যান্ডার্ডাইজড ম্যাথ এক্সামে ভালো করার সম্ভাবনা প্রায় ৯% থেকে ১০% কমে যায়!
স্ক্রিন আসক্তি কীভাবে গণিতের দক্ষতা নষ্ট করে?
১. ধৈর্য ও মনোযোগের ঘাটতি (Loss of Stamina): মোবাইল বা ট্যাবের দুনিয়া মানেই দ্রুত স্ক্রোলিং আর ইনস্ট্যান্ট আনন্দ (Instant Gratification)। কিন্তু অংক করার জন্য প্রয়োজন গভীর মনোযোগ ও ধাপে ধাপে চিন্তা করার ধৈর্য। স্ক্রিনে অভ্যস্ত ব্রেইন ৩-৪ লাইনের একটি জটিল অংক করার আগেই হাল ছেড়ে দেয়।
২. ওয়ার্কিং মেমোরি দুর্বল হওয়া: গণিত সমাধানের সময় ব্রেইনকে একসাথে কয়েকটি তথ্য মাথায় ধরে রাখতে হয় (যেমন: সূত্রে কী বসবে, হাতে কত থাকলো ইত্যাদি)। স্ক্রিনের অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো ও দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিজ্যুয়াল উপাদান বাচ্চার এই "ওয়ার্কিং মেমোরি" বা কাজের স্মৃতিকে ক্লান্ত ও ব্লক করে ফেলে।
৩. বাস্তব চিন্তার অভাব: জ্যামিতি বা গ্রাফের মতো বিষয়গুলো বোঝার জন্য যে স্থানিক দক্ষতা (Spatial Skills) দরকার, তা আসে বাস্তব জগতের খেলাধুলা বা লেগো/ব্লক মেলানোর মাধ্যমে। সারাদিনের অনেকটা সময় স্ক্রিনে মুখ গুঁজে থাকলে এই ত্রিমাত্রিক চিন্তার ক্ষমতা তৈরি হয় না।
বাবা-মা হিসেবে আমাদের করণীয় কী?
-- বাস্তব উদাহরণ দিয়ে অংক শেখান: ভগ্নাংশ শেখাতে পিৎজা বা কেক কাটার উদাহরণ দিন। লাভ-ক্ষতি বা সাধারণ যোগ-বিয়োগ শেখাতে দোকানে নিয়ে গিয়ে বাস্তব টাকার হিসাব করতে দিন।
-- পমোডোরো পদ্ধতি ব্যবহার করুন: তাকে বলুন, "মাত্র ২০ মিনিট কোনো পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে অংক করবে, তারপর ৫ মিনিটের ব্রেক পাবে। কিংবা অন্য কোনো রিওয়ার্ডও এড করা যায় সাথে। এতে মনোযোগের পরিধি (Attention Span) বাড়তে পারে।
-- প্যাসিভ স্ক্রিনকে অ্যাক্টিভ করুন:
যদি স্ক্রীন বন্ধ রাখা সম্পূর্ণ সম্ভব না হয় সেক্ষেত্রে। কার্টুন বা রিলস স্ক্রোল করতে না দিয়ে দিনে ৩০-৪৫ মিনিট 'খান একাডেমি' বা 'প্রডিজি ম্যাথ'-এর মতো শিক্ষণীয় কিছু দেখতে বা খেলতে দিতে পারেন অভিভাবকের তত্বাবধানে৷ স্ক্রীনের কন্টেন্ট কি - অন্তত সেটি সুপারভাইস করা ভীষন ভীষন জরুরী।
-- ঘুমানোর ২ ঘণ্টা আগে নো-স্ক্রিন রুল: ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে মোবাইল, ট্যাব বা টিভি পুরোপুরি বন্ধ রাখুন। এটি ব্রেইনের লজিক্যাল থিংকিং ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বর্তমান চাইল্ডহুড় ডেভেলপমেন্ট এক্সপার্টরা ভীষন জোর দিচ্ছেন।
পরিশেষে গেইম নিয়ে কিছু কথা:
যেসব গেইম যে ধরণের গেম গণিতের এবং সামগ্রিক মানসিক বিকাশের মারাত্মক ক্ষতি করে Action or, Fast-paced Games like Free Fire, PUBG, Subway Surfers, Temple Run, Brawl stars, Call of Duty, Gacha/Clicker Games, Roblox, Action & Shooter Games - এগুলো ন প্রমানিত, আর রিসার্চে প্রাপ্ত। আরো বেশ নাম কিছু রয়েছে যেগুলোর প্রভাব হয়তো বোঝা যাবে অদূর ভবিষতে কিংবা গবেষনায় উঠে আসবে বাচ্চাদের অনেকটা ক্ষতি হয়ে যাবার পরে। এই গেমগুলোতে সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং ব্রেইন প্রচুর পরিমাণে "ডোপামিন" হরমোন নিঃসরণ করে। এর ফলে বাচ্চার ব্রেইন অতি-উত্তেজিত (Overstimulated) হয়ে পড়ে। এগুলো বাচ্চার ব্রেইনকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড মনোযোগ দিতে শেখায়। ফলে একটি বাচ্চা যখন স্কুলের বড় কোনো প্রশ্নের সমাধান বা অংক করতে যায়,কিংবা অন্য কোনো লজিক্যাল থিংকিং এর সমস্যা সলভ করতে যায়, তখন তার ব্রেইন ২-৩ মিনিটের বেশি মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।
শুভকামনা সবার জন্য।
Sources:
The JAMA Network Open Longitudinal Study (2025),
Comprehensive Meta-Analysis on Math Performance (2024–2025),
The Math Anxiety Mediation Studies (2024–2026)