03/10/2024
মৃত ব্যাক্তির গোসল, জানাযা, কাফন, দাফন, ঈসালে সওয়াব বিষয়ক প্রশ্ন-উত্তর (১ম পর্ব)
মুমূর্ষু অবস্থায় করণীয়, মৃত্যুর সংবাদ প্রচার, গোসল, কবর খনন
=====================================
৪২৯৭. প্রশ্নঃ
কিছুদিন আগে আমাদের এলাকার একজন মুরুব্বী ইন্তেকাল করেন। তার মুমূর্ষু অবস্থায় মসজিদের ইমাম সাহেবসহ আমরা কিছু লোক সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তখন তাকে কীভাবে শোয়ানো হবে এ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। ইমাম সাহেব তাকে উত্তরঃ দিকে মাথা ও দক্ষিণ দিকে পা দিয়ে চেহারা কেবলার দিকে ফিরিয়ে শোয়াতে চাচ্ছিলেন। একজন এতে বাধা দিয়ে বলল, ‘বেহেশতী জেওর’ কিতাবে পশ্চিম দিকে পা ও পূর্ব দিকে মাথা দিয়ে এবং মাথার নিচে উঁচু কোনো বস্তু দিয়ে শোয়াতে বলা হয়েছে। যেন চেহারা পশ্চিম দিকে হয়ে যায়। জানার বিষয় হল, এক্ষেত্রে উত্তম এবং সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি কোনটি? জানালে উপকার হবে।
উত্তরঃ
মুমূর্ষু ব্যক্তিকে যদি সহজে কিবলামুখী করে শোয়ানো সম্ভব হয় তাহলে সেভাবেই শোয়ানো উত্তম হবে। আর কিবলামুখী শোয়ানোর দুটি পদ্ধতি আছে। একটি হল, বেহেশতী জেওরে উল্লেখিত পদ্ধতি। আরেকটি হল, আমাদের দেশের হিসাবে উত্তরঃ দিকে রোগীর মাথা ও দক্ষিণ দিকে পা দিয়ে ডান কাত করে শোয়ানো। এটি অধিক উত্তম ও সুন্নাহসম্মত। তাই সম্ভব হলে এভাবে শোয়ানো উত্তম হবে। অন্যথায় বেহেশতী জেওরে যেভাবে শোয়ানোর কথা আছে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে পা ও পূর্ব দিকে মাথা দিয়ে এবং মাথার নিচে উঁচু কোনো বস্তু দিয়ে কিবলামুখী করে শোয়াবে। কিন্তু যদি কিবলামুখী করে শোয়ানো সম্ভব না হয় তাহলে যেভাবে শোয়ালে তার জন্য সহজ ও আরামদায়ক হয় সেভাবে শোয়াবে।
-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ৬০৫৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/২২; ফাতহুল কাদীর ২/৬৭; শরহুল মুনয়া পৃ. ৫৭৬; হালবাতুল মুজাল্লী ২/৫৯৬; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাল মারাকী পৃ. ৩০৫; রদ্দুল মুহতার ২/১৮৯; ইমদাদুল আহকাম ১/৮২০
২২২৭. প্রশ্নঃ
আমাদের গ্রামে কোনো মানুষ মারা গেলে পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহে ঘুরে ঘুরে মাইকে তার মৃত্যুর সংবাদ শুনানো হয়। এবং তার জানাযা নামাযে শরিক হওয়ার জন্য আহবান করা হয়। জানতে চাই, শরীয়তের দৃষ্টিতে এ কাজটি কি বৈধ?
উত্তরঃ
কেউ মারা গেলে তার মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা এবং জানাযার এলান করা জায়েয আছে। প্রয়োজনে মাইক দিয়েও প্রচার করা যাবে। এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য থাকবে জানাযায় শরিক হওয়ার জন্য মানুষকে আহবান করা। তবে এতে মৃতের গুণগান প্রচার করা যাবে না। কেননা, হাদীসে মৃতের গুণগাণ ও বড়ত্ব বর্ণনা করে এলান করতে নিষেধ করা হয়েছে।
-সহীহ বুখারী ১/১৬৭; ফাতহুল বারী ৩/১৪০; উমদাতুল কারী ৭/২০; আদ্দুররুল মুখতার ২/২৩৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/২২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৫৭
৪৫৩৫. প্রশ্নঃ
জনৈক আলেম তিরমিযী শরীফে বর্ণিত-
إِيّاكُمْ وَالنّعْيَ، فَإِنّ النّعْيَ مِنْ عَمَلِ الجَاهِلِيّةِ.
‘মৃত্যু-সংবাদ উচ্চস্বরে প্রচার থেকে বিরত থাক’- হাদীসটিসহ অনেক সাহাবী তাদের মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করতে নিষেধ করেছেন মর্মের হাদীসগুলো দিয়ে মৃত্যু সংবাদ উচ্চস্বরে বা মাইকে প্রচার করতে নিষেধ করেন। আর বুখারীতে বর্ণিত বাদশাহ নাজাশীর মৃত্যুর খবর নবীজী দিয়েছিলেন- হাদীসটি তিনি সাধারণভাবে ফোনে বা মৌখিকভাবে আত্মীয়-স্বজনকে জানানোর উপর প্রয়োগ করেন। সত্যি কি মৃত্যু-সংবাদ উচ্চস্বরে বলা বা মাইকিং করা নিষেধ? তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীস এবং সাহাবীদের নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত আছার দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তরঃ
মায়্যেতের জানাযায় অধিক সংখ্যক মুসল্লীর উপস্থিতি শরীয়তে কাম্য। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَا مِنْ مَيِّتٍ تُصَلِّي عَلَيْهِ أُمّةٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يَبْلُغُونَ مِائَةً، كُلّهُمْ يَشْفَعُونَ لَهُ، إِلاّ شُفِّعُوا فِيهِ.
কোনো মায়্যেতের জানাযার নামায একশ জন মুসলমান পড়ল, যারা সকলে তার মাগফিরাতের জন্য শাফাআত করে তবে তাদের এ শাফাআত অবশ্যই কবুল করা হবে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯৪৭
আর জানাযার নামাযে শরীক হওয়া সওয়াবের কাজ এবং জীবিতদের উপর মৃত মুসলমানের হক। এজন্যই কিছু হাদীস ও আছারে জানাযায় অংশগ্রহণের জন্য মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করার ব্যাপারে নির্দেশনা এসেছে। সহীহ বুখারীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে-
مَاتَ إِنْسَانٌ كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَعُودُهُ، فَمَاتَ بِاللّيْلِ، فَدَفَنُوهُ لَيْلًا، فَلَمّا أَصْبَحَ أَخْبَرُوهُ، فَقَالَ: مَا مَنَعَكُمْ أَنْ تُعْلِمُونِي؟
এক ব্যক্তি রাতে ইন্তিকাল করলে সাহাবীগণ তাকে রাতেই দাফন করে দেন। সকালে সংবাদটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালে তিনি বলেন, কেন তোমরা আমাকে (তখন) জানালে না? -সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৪৭
এক হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে-
أَنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ نَعَى النّجَاشِيّ فِي اليَوْمِ الّذِي مَاتَ فِيهِ خَرَجَ إِلَى المُصَلّى، فَصَفّ بِهِمْ وَكَبّرَ أَرْبَعًا.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজাশী বাদশার ইন্তেকালের দিন তাঁর মৃত্যু-সংবাদ দিয়ে জানাযার স্থানে গেলেন, অতপর সাহাবায়ে কেরামকে কাতার বন্দি করে চার তাকবীরের সাথে জানাযা আদায় করলেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৪৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯৫১
সুনানে বায়হাকীর (৪/৪৭) এক বর্ণনায় এসেছে, রাফে ইবনে খাদীজ রা. আসরের পর ইন্তেকাল করলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-কে তাঁর মৃত্যু-সংবাদ দিয়ে জিজ্ঞেস করা হল, তাঁর জানাযা কি এখন পড়া যেতে পারে? তিনি বলেন-
إِنّ مِثْلَ رَافِعٍ لَا يُخْرَجُ بِهِ حَتّى يُؤْذَنَ بِهِ مَنْ حَوْلنَا مِنَ الْقُرَى.
আশপাশের গ্রামসমূহে খবর না দিয়ে রাফের মত ব্যক্তির জানাযা পড়া যায় না।
এ জাতীয় হাদীস-আছারের আলোকে ফকীহগণ বলেন, জানাযার নামাযে অংশগ্রহণের জন্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের মৃত্যু-সংবাদ দেওয়া মুস্তাহাব। কিন্তু জানাযার উদ্দেশ্য ছাড়া মায়্যেতের গুণাবলী বর্ণনার উদ্দেশ্যে মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করা বা বিলাপ-আর্তনাদের সাথে মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করার ব্যাপারে হাদীসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., হযরত হুযায়ফা রা. প্রমুখ সাহাবীগণ নিজেদের মৃত্যু-সংবাদ এভাবে প্রচারিত হওয়ার ভয় করেই মৃত্যু-সংবাদ কাউকে না জানাতে বলেছেন। (দ্রষ্টব্য : জামে তিরমিযী, হাদীস ৯৮৪-৯৮৬)
প্রশ্নে জামে তিরমিযীর বরাতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীস-
إِيّاكُمْ وَالنّعْيَ، فَإِنّ النّعْيَ مِنْ عَمَلِ الجَاهِلِيّةِ.
ও এ সংক্রান্ত অন্যান্য হাদীস-আছার দ্বারা মৃত্যুর কারণে বিলাপ আর্তনাদ করা বা মৃতের গুণাবলী বর্ণনাসহ মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। হাদীস ব্যাখ্যাকারগণ এমনই বলেছেন। এতে জানাযা ও দাফনে শরীক হওয়ার জন্য মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করাকে নিষেধ করা হয়নি। নিম্নে তাঁদের কিছু ব্যাখ্যা ও উক্তি উদ্ধৃত হল।
ইমাম নববী রাহ. বলেন-
وَفِيهِ اسْتِحْبَابُ الْإِعْلَامِ بِالْمَيِّتِ لَا عَلَى صُورَةِ نَعْيِ الْجَاهِلِيّةِ، بَلْ مُجَرّدِ إِعْلَامِ الصّلَاةِ عَلَيْهِ وَتَشْيِيعِهِ وَقَضَاءِ حَقِّهِ فِي ذَلِكَ، وَالّذِي جَاءَ مِنَ النّهْيِ عَنِ النّعْيِ لَيْسَ الْمُرَادُ بِهِ هَذَا، وَإِنَّمَا الْمُرَادُ نَعْيُ الْجَاهِلِيّةِ الْمُشْتَمِلُ عَلَى ذِكْرِ الْمَفَاخِرِ وَغَيْرِهَا.
অর্থাৎ, ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগের মত না করে শুধু জানাযার নামাযের সংবাদ দেওয়ার জন্য মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করা মুস্তাহাব। কেননা হাদীসে জাহেলী যুগের মত মৃতের গুণগান গেয়ে মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করতে নিষেধ করা হয়েছে। -আল মিনহাজ, শরহে নববী ৭/২১
হাফেজ ইবনে হাজার রাহ. বলেন, মৃত্যু-সংবাদ প্রচার নিষেধ নয়, নিষেধ তো হল জাহেলী যুগের কর্মকাণ্ড। -ফাতহুল বারী ৩/১৪০
ইবনুল আরাবী রাহ. বলেন, মৃত্যু-সংবাদ প্রচার সংক্রান্ত হাদীসগুলোর সারকথা হল-
১. আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও নেককারদের মৃত্যু-সংবাদ দেওয়া সুন্নাত।
২. মৃতের প্রভাব-প্রতিপত্তি উল্লেখ করে মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করা মাকরূহ।
৩. বিলাপ, আর্তনাদের সাথে প্রচার করা হারাম। -ফাতহুল বারী ৩/১৪০
আরো দ্রষ্টব্য : আরেযাতুল আহওয়াযী, ইবনুল আরাবী কৃত ৪/২০৬
ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. বলেন, জানাযার কথা প্রচার করতে সমস্যা নেই। -আল জামেউস সগীর পৃ. ৭৯
ইবরাহীম হালাবী রাহ. বলেন, বিশুদ্ধ মত হল, মৃতব্যক্তির গর্ব-গৌরবের উল্লেখ ছাড়া সাধারণভাবে অলিতে-গলিতে মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করা দোষণীয় নয়। কেননা (نعي الجاهلية) জাহেলী যুগের প্রচার তো হল, বিলাপ-আর্তনাদের সাথে মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করা। -শরহুল মুনয়া, পৃষ্ঠা ৬০৩
মোটকথা, জামে তিরমিযীর উক্ত হাদীসে সাধারণভাবে মৃত্যু-সংবাদ ঘোষণা করতে নিষেধ করা হয়নি।
সুতরাং সাধারণভাবে মৃত্যু-সংবাদ পৌঁছাতে কোনো সমস্যা নেই। আর তা মৌখিকভাবে যেমন করা যায়, তদ্রূপ বর্তমানে মাইকের মাধ্যমে আরো সহজেই পৌঁছানো যায়।
উল্লেখ্য যে, জানাযা কখন হবে এটি কোনো এলাকায় একবার জানিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট। কিন্তু কোথাও কোথাও দেখা যায় দীর্ঘ সময় নিয়ে মাইকে একই ঘোষণা বহুবার করা হয়ে থাকে। এমনটি করা ঠিক নয়। কেননা এতে অন্যদের কষ্ট হতে পারে।
২১৩৫. প্রশ্নঃ
আমাদের মসজিদের মাইকে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা হয়, জানাযার জন্য ডাকা এবং কারো কোনো ছাগল/গরু হারিয়ে গেলে এর ঘোষণাও মসজিদের মাইকে দেওয়া হয়। জানতে চাই, এসব কাজ বৈধ কি না?
উত্তরঃ
মসজিদের মাইক আপনস্থানে রেখে (মাইক মসজিদের ভিতরে হোক বা বাইরে) এতে কারো জানাযার ঘোষণা করা নাজায়েয নয়। তদ্রƒপ এই এলানও মসজিদে করা বৈধ। আর মসজিদের বাইরে পাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া বস্তুর এলান মসজিদে এসে করা বৈধ নয়। হাদীস শরীফে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। মসজিদের বাইরে হারানো বা পাওয়া বস্তুর এলানের জন্য মসজিদের মাইক ব্যবহার করাও বৈধ নয়।
- সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৫৬৮; উমদাতুল কারী ৮/১৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ২/৪৫৯; মাআরিফুস সুনান ৩/৩১৩; ফাতহুল কাদীর ৫/৩৫২; বেনায়াহ ৯/৪৬৫; রদ্দুল মুহতার ১/৬৬০
২৪০১. প্রশ্নঃ
বর্তমান সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলন রয়েছে যে, কারো মৃত্যু হলে নিকটাত্মীয়-স্বজনদের উপস্থিতির জন্য মাইয়েতের গোসল, কাফন-দাফন, জানাযা ইত্যাদি বিলম্ব করা হয়।
জানার বিষয় হল, মাইয়েতের নিকটাত্মীয়ের জন্য কাফন-দাফন বিলম্ব করা যেতে পারে কি না এবং এভাবে প্রচলিত নিয়মে বিলম্ব করা বৈধ হবে কি না? উত্তরঃ প্রদান করে উপকৃত করার আবেদন রইল।
উত্তরঃ
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার গোসল, কাফন, জানাযা ও দাফনের কাজ যথাসম্ভব দ্রুত সম্পাদন করা উচিত। হাদীস শরীফে এ বিষয়ে বিশেষভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
আর মৃতের নিকটাত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব ও পাড়া প্রতিবেশীদেরকে তার মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া মুস্তাহাব। যাতে তারা জানাযায় শরিক হতে পারে। তবে কোনো আত্মীয়ের উপস্থিতি বা তাদের দেখানোর জন্য মৃতের দাফনে বিলম্ব করা অনুচিত। বিশেষ করে বর্তমান সমাজে প্রচলিত প্রথা-আত্মীয় স্বজন যত দূরেই থাকুক, মৃতের মুখ দেখানোর অপেক্ষায় গোসল, কাফনদাফন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিনও বিলম্ব করা হয়-যা কোনো ক্রমেই শরীয়তসম্মত নয়।
-সহীহ বুখারী ১/১৭৫; ফাতহুল বারী ৩/২১৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/১৯৩; বাদায়েউস সানায়ে ২/২৩; আলবাহরুর রায়েক ২/১৭১
৪৬০১. প্রশ্নঃ
মৃতব্যক্তির পাশে বসে কুরআন তিলাওয়াতের হুকুম কী? এ সম্পর্কে বিভিন্নজনকে বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে শোনা যায়। কেউ বলে, গোসল দেওয়ার পূর্বে মৃতব্যক্তি নাপাক তাই সেখানে কুরাআন তিলাওয়াত করা যাবে না। কেউ বলে, মনে মনে তিলাওয়াত করা যাবে। কেউ বলে, জোরে তিলাওয়াত করাও জায়েয। আসলে সঠিক মাসআলা কোনটি? দলীল-প্রমাণ উল্লেখপূর্বক বিস্তারিত জানালে কৃতজ্ঞ হব।
উত্তরঃ
মৃত ব্যক্তির পাশে নিঃশব্দে গোসলের আগেও কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েয। আর লাশ আপাদমস্তক ঢেকে দিলে গোসল দেওয়ার পূর্বেও তার পাশে সশব্দে তিলাওয়াত করা জায়েয আছে। তবে গোসল দেওয়ার আগে মায়্যিতকে না ঢেকে তার পাশে বসে সশব্দে কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরূহ।
-তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/৫৬৪; শরহুল মুনয়া পৃ. ৫৭৭; আলবাহরুর রায়েক ২/১৭১; হালবাতুল মুজাল্লী ২/৫৯৭; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদ্দুর ১/৩৬৫
৩৯৯১. প্রশ্নঃ
কয়েক দিন আগে আমার বড় মামা মারা গিয়েছেন। গোসল দেওয়ার পর জানাযার নামাযের বেশ আগেই তার লাশ মসজিদের সামনে রাখা হয়। আমার এক মামাতো ভাই মাদরাসার কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে এলেন। কফিনের কাছে তাদেরকে তিলাওয়াত করতে বসালেন। আমার মনে একটু খটকা লাগল। কোথায় যেন শুনেছি, মৃত ব্যক্তির পাশে বসে তিলাওয়াত করা উচিত নয়। তবে স্পষ্ট কিছু মনে নেই। তাই সঠিক বিষয়টি জানতে চাই।
উত্তরঃ
গোসল দেওয়ার পর লাশের কাছে কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েয। কিন্তু গোসল দেওয়ার আগেমৃত ব্যক্তির নিকটে কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরূহ। প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে মাইয়্যেতের গোসলের পরেযেহেতু তার কাছে তিলাওয়াত করা হয়েছে তাই এতে দোষের কিছু হয়নি।
প্রকাশ থাকে যে, মাইয়্যেতের গোসলের আগে দূরে কোথাও যেমন অন্য ঘরে মৃতের ঈসালেসওয়াবের নিয়তে কুরআন তিলাওয়াত করতে কোনো অসুবিধা নেই।
-তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/৫৬৪; আলবাহরুর রায়েক ২/১৭১; হালবাতুল মুজাল্লী ২/৫৯৭; রদ্দুল মুহতার ২/১৯৪
২২২৬. প্রশ্নঃ
আমার মহল্লার এক মহিলার ইন্তেকালের পর স্বামী তাকে দেখতে আসলে লোকজন তাকে দেখতে দেয়নি এবং তারা বলে, স্বামীর জন্য তার মৃত স্ত্রীর চেহারা দেখা জায়েয নেই। জানতে চাই, স্ত্রীর ইন্তেকালের পর স্বামী স্ত্রীর চেহারা দেখতে পারে কি না? তেমনিভাবে স্বামীর ইন্তেকালের পর স্ত্রী তার চেহারা দেখতে পারবে কি?
উত্তরঃ
মৃত স্ত্রীর চেহারা স্বামী দেখতে পারবে। তদ্রূপ মৃত স্বামীর চেহারাও স্ত্রী দেখতে পারবে। তাই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে লোকটিকে তার মৃত স্ত্রীর চেহারা দেখতে না দেওয়া অন্যায় হয়েছে।
-মুয়াত্তা ইমাম মালেক ৭৭; ইলাউস সুনান ৫/২২৩; আদ্দুররুল মুখতার ২/১৯৮; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/১৩৭; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৪০৮
৪২১৬. প্রশ্নঃ
আমাদের এলাকায় এক মহিলা মারা যাওয়ার পর তার স্বামী তাকে গোসল দিতে চাইলে কিছু লোক তাকে মানা করে বলে যে, স্ত্রী মারা যাওয়ার পর স্বামীর জন্য তার স্ত্রীকে দেখা, স্পর্শ করা এবং গোসল দেওয়া সবই হারাম হয়ে যায়। কিন্তু লোকটি কারো কথা না শুনে স্ত্রীকে গোসল দিয়ে দেয়। পরে মসজিদের ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন এ কাজটি মাকরূহ হয়েছে। তাই এখন জানার বিষয় হল এক্ষেত্রে সঠিক মাসআলা কী? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তরঃ
বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী স্বামীর জন্য তার মৃত স্ত্রীর চেহারা দেখা জায়েয। মৃত স্ত্রীর চেহারা দেখা হারাম বলা ঠিক নয়। কিন্তু স্বামীর জন্য মৃত স্ত্রীকে স্পর্শ করা, গোসল দেওয়া জায়েয নয়। সুতরাং প্রশ্নোক্ত ব্যক্তির জন্য তার মৃত স্ত্রীকে গোসল দেওয়া অন্যায় হয়েছে। এজন্য তাকে ইস্তেগফার করতে হবে।
কিতাবুল আছল ১/৩৫৭; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৫০; আলবাহরুর রায়েক ২/১৭৩; আদ্দুররুল মুখতার ২/১৯৮
৪৩৭১. প্রশ্নঃ
একবার কুরবানী ঈদে লঞ্চডুবিতে অনেক মানুষ মারা যায়। নিহতদের উদ্ধারের পর আত্মীয়-স্বজনরা এসে যার যার লাশ নিয়ে যায়। অবশেষে এমন কিছু লাশ থেকে যায়, যাদের ঠিকানা ও স্বজনদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তখন স্থানীয়রা প্রতিটি লাশ গোসল দেওয়া ছাড়াই কাফন পরিয়ে জানাযার নামাযের পর দাফন করে দেয়।
আমার জিজ্ঞাসা হল, মৃত্যুর পর নদীতে থাকার পরও কি গোসল দেওয়ার প্রয়োজন আছে? যদি থেকে থাকে তাহলে প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে গোসল দেওয়া ছাড়া জানাযার নামায পড়া কি ঠিক হয়েছে?
উত্তরঃ
জীবিতদের উপর ফরয দায়িত্ব মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া। তাই পুকুর বা নদীতে পাওয়া গেলেও তাকে গোসল দেওয়া কর্তব্য। তবে নদী থেকে উঠানোর সময় যদি গোসলের উদ্দেশ্যে পানিতে নাড়া চাড়া দেওয়া হয় তাহলে সেক্ষেত্রে গোসল দেওয়ার ফরয আদায় হয়ে যায়। তবে প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে জানাযার নামায শুদ্ধ হয়ে গেছে।
কেননা, জানাযার নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত হল লাশ পবিত্র হওয়া। আর পানিতে পাওয়ার কারণে লাশ পবিত্র ধরা হবে।
-ফাতাওয়া খানিয়া ১/১৮৭; আদ্দুররুল মুখতার ২/২০০; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ ২/২৪১; আলবাহরুর রায়েক ১/৬৫
৩৯৫৩. প্রশ্নঃ
কিছুদিন আগে আমাদের এলাকার এক ব্যক্তি নিখোঁজ হয়ে যায়। অনেক দিন খোঁজাখুজির পরও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। একদিন হঠাৎ তার কর্তিত মস্তক নদীতে পাওয়া যায়। এ অবস্থায় এটির গোসল, নামায এবং দাফন-কাফন কীভাবে করতে হবে?
উত্তরঃ
মৃত ব্যক্তির শুধু মাথা বা হাত-পা কিংবা কর্তিত অল্প অংশ পাওয়া গেলে এর গোসল, জানাযা কিছুই দিতে হয় না। তাই প্রশ্নোক্ত মস্তকটি পবিত্র কাপড়ে মুড়িয়ে দাফন করে দিবে। উক্ত মাথার গোসল দেওয়া বা জানাযা পড়া যাবে না।
প্রকাশ থাকে যে, মৃতদেহের মস্তকসহ অর্ধেক পাওয়া গেলে কিংবা মাথা ছাড়া অর্ধেকের বেশি পাওয়া গেলে পূর্ণ লাশের হুকুমে ধর্তব্য হবে। সেক্ষেত্রে তার গোসল ও জানাযা সবকিছুই নিয়ম মাফিক করতে হবে।
-কিতাবুল আছল ১/৩৪১; ফাতহুল কাদীর ২/৭৬; ইমদাদুল ফাত্তাহ ৬১২; শরহুল মুনইয়াহ ৫৯০; আদ্দুররুল মুখতার ২/১৯৯
৩৯৯২ . প্রশ্নঃ
আমার বড় ভাইজান ভালো আলেম ও বুযুর্গ ছিলেন। সমাজে তার বেশ সুনাম-সুখ্যাতি ছিল। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে তিনি বাতিলের
বিরুদ্ধে সাহসী বয়ান করতেন। এভাবে তার কিছু শত্রুও গড়ে ওঠেছিল। ভাইজান সিলেট শহরেই থাকতেন। একবার তিনি সীমান্ত
পার্শ্ববর্তী গোয়াইঘাটে একটি দ্বীনী প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য সফর করছিলেন। গাড়ি কোম্পানিগঞ্জ পার হয়ে সামনে এগুলে এক
জনমানবহীন সড়কে পৌঁছলে একদল দুর্বৃত্ত ভাইজানের ওপর সশস্ত্র হামলা করে বসে। তারা বুলেটের আঘাতে ভাইজানের দেহ ঝাঁজরা করে দেয়। এম্বুলেন্সে করে লাশ এলাকায় আনা হলে ভাইজানকে গোসল দেওয়া হবে কি না এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক
মতানৈক্য দেখা দেয়। অবশেষে ইমাম সাহেবের ফয়সালাক্রমে গোসল করিয়ে ভাইজানকে আলাদা কাফন পরানো হয়। এরপর জানাযা শেষে তাকে দাফন করা হয়। কিন্তু তারপরও গোসলের বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে কানাঘুষা চলতে থাকে। তাদের বক্তব্য, শহীদকে গোসল দেওয়ার কোনো বিধান নেই। তাকে তার রক্ত মাখা কাপড়ই দাফন করা নিয়ম। এখন মাননীয় মুফতী সাহেবের
কাছে বিষয়টির প্রকৃত সমাধান জানতে চাচ্ছি। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
উত্তরঃ
প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী আপনার ভাই শহীদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা ডাকাত ও দুর্বৃত্তদের হাতে নিহতব্যক্তি শহীদের হুকুমে। তাকে গোসল দিতে হয় না। তাই তাকে গোসল না দিয়ে পরিহিত পোশাকেদাফন করাই উচিত ছিল। ভুল হলেও যেহেতু দাফন হয়ে গেছে তাই এখন বিষয়টি নিয়ে বিতর্কেলিপ্ত হওয়া ঠিক হবে না।
عَنِ الشَّعْبِيِّ قَالَ: سُئِلَ عَنْ رَجُلٍ قَتَلَهُ اللُّصُوصُ فَقَالَ: لَا يُغَسَّلُ
শাবী রাহ.-কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, যে চোরদের হাতে নিহত হয়েছে। তিনি বললেন, তাকে গোসল দেওয়া হবে না।
-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ৬৬৪৮, ৯৫৯৪; কিতাবুল আছল ১/৩৩৯; আলজামিউস সগীর ১১৮-১১৯; শরহুয যিয়াদাত ১/১৮৬-১৮৭; আদ্দুররুল মুখতার ২/২৪৭-২৫০
২০৭৪. প্রশ্নঃ
কিছুদিন আগে ধানক্ষেতে একটি লাশ পাওয়া যায়। লাশটি এতই নরম ছিল যে, ডলে ডলে গোসল দিতে গেলে চামড়া খসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে লাশকে গোসল দেওয়া কি জরুরি? যদি জরুরি হয় তাহলে কীভাবে গোসল দিবে?
উত্তরঃ
এ ধরনের নরম লাশকেও গোসল দেওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে শরীরের উপর শুধু পানি ঢেলে দিবে। ডলে ডলে ধোয়ার প্রয়োজন নেই।
-ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/১৩৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৫৮; মারাকিল ফালাহ ৩১২
১৪৫৫. প্রশ্নঃ
আমাদের এলাকায় মৃত ব্যক্তিকে বড়ই পাতার পানি দিয়ে গোসল দেওয়ার নিয়ম আছে। এটা কি জরুরি? যদি বড়ই পাতা না পাওয়া যায় তাহলে কোন ধরনের পানি দিয়ে গোসল দিতে হবে? জানালে উপকৃত হব।
উত্তর
মৃত ব্যক্তিকে বড়ই পাতা মিশ্রিত সিদ্ধ পানি দিয়ে গোসল দেওয়ার বিয়য়টি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। মৃতের গোসলের পানিতে বড়ই পাতা দেওয়া মুস্তাহাব, জরুরি নয়। বড়ই পাতা পাওয়া না গেলে সাধারণ পানি দিয়েই গোসল দিবে। অবশ্য ময়লা কেটে যাওয়ার জন্য সাবান বা এ জাতীয় অন্য কিছু ব্যবহার করা ভালো।
-সহীহ মুসলিম ১/৩০৪; শরহে মুসলিম নববী ১/৩০৪; উমদাতুল কারী ৮/৩৬; বাদায়েউস সানায়ে ২/৩০৮; ফাতহুল কাদীর ২/১১১; শরহুল মুনিয়্যাহ ৫৭৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৫৮
৩৮৫৬. প্রশ্নঃ
আমাদের এক আত্মীয় মারা যাওয়ার পর তার ঘরের লোকেরা তার নখ কেটে দেয়। এভাবে তাদের জন্য মৃতব্যক্তির নখ কাটা জায়েয হয়েছে কি? এমনিভাবে মৃতব্যক্তির গোঁফ চুল ইত্যাদি কাটা জায়েয আছে কি?
উত্তরঃ
মৃত ব্যক্তির গোঁফ, চুল, নখ ইত্যাদি কাটা জায়েয নয়। ইবনে সিরীন রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,لَا يُؤْخَذُ مِنْ شَعْرِ الْمَيِّتِ، وَلَا مِنْ أَظْفَارِهِ
মৃতব্যক্তির চুল ও নখ কাটা যাবে না। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ৬২২৮)
তাই মৃত লোকটির নখ টাকা ঠিক হয়নি।
-ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৫৮; বাদায়েউস সানায়ে ২/২৬; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৪৯
৫০২১. প্রশ্নঃ
মুহতারাম, গত ২৩শে আগস্ট আমার এক নিকটাত্মীয় মারা যায়। সেই মায়্যেতকে গোসল করানোর জন্য আমি ও গ্রামের ইমাম সাহেবসহ আরেকজন ছিলাম। গোসল শেষে ইমাম সাহেব হালকাভাবে চেহারাটা মুছে মায়্যেতকে অযু করিয়ে দিলেন। তারপর পুরো চেহারা ভালোভাবে না মুছিয়েই দাফন করাতে চাইলেন। তখন আমি বললাম পুরো শরীর মুছবেন না কেন? কারণ আমার জানা মতে পূর্ণ শরীর মুছতে হবে। তখন ইমাম সাহেব বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক সাহাবী মারা যাওয়ার পর জান্নাতের পানি দ্বারা তাকে গোসল করালেন এবং শরীর থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছিল। এমতাবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দাফন করে দিলেন। (অর্থাৎ কাফন পরিয়ে) দিলেন। সুতরাং পুরো শরীর ভালোভাবে মুছার প্রয়োজন নেই।
এখন হুযুরের কাছে আমার জানার বিষয় হল-
১. মায়্যেতকে গোসলের পর অযু করানো যাবে কি না? না হলে এর বিধান কী?
২. মায়্যেতকে গোসলের পর পুরো শরীর ভালোভাবে মুছতে হবে কি না? এবং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে ইমাম সাহেবের কথা সহীহ কি না? দলীলসহ জানালে উপকৃত হব।
উত্তরঃ
১. মায়্যেতকে গোসলের আগেই যথানিয়মে অযু করিয়ে দেওয়া সুন্নত। গোসলের পর অযু করানোর নিয়ম নেই। তাই আগে অযু করানো না হলে পরে আর করাবে না। কেননা গোসলের দ্বারা অযুও হয়ে যায়। সহীহ বুখারীর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, উম্মে আতিয়্যাহ রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক মেয়ের ইন্তেকালের পর তার গোসল প্রসঙ্গে মহিলাদেরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন-
ابْدَأْنَ بِمَيَامِنِهَا، وَمَوَاضِعِ الوُضُوءِ مِنْهَا.
অর্থাৎ তোমরা (গোসল করানোর ক্ষেত্রে) তাঁর ডান দিক থেকে এবং অযুর স্থানসমূহ দ্বারা শুরু করো। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৫৫)
উক্ত হাদীসের আলোকে ইমাম আবু বকর জাসসাস রাহ. বলেন-
يوضأ وضوءه للصلاة أولاً.
অর্থাৎ মায়্যেতকে প্রথমে নামাযের অযুর মত অযু করাবে। (শরহু মুখতাসারিত তহাবী ২/১৮৭)
প্রসিদ্ধ তাবেয়ী ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন-
يُبْدَأُ بِالْمَيِّتِ فَيُوَضّأُ وُضُوءَهُ لِلصّلاَةِ ثُمّ يَبدَأ بِمَيَامِنِه.
মায়্যেতকে (গোসলের শুরুতে) প্রথমে নামাযের অযুর ন্যায় অযু করাবে। এরপর তার ডান দিক থেকে (ধোয়া) শুরু করবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ১১০০১)
২. উক্ত কথা ঠিক নয়। নিয়ম হল, গোসল দেয়ার পর তার পুরো শরীর শুকনো পবিত্র কোনো কাপড় দিয়ে মুছে দেওয়া। ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. মায়্যেতের গোসলের বিবরণ দেওয়ার পর বলেন-
ثم تنشفه في ثوب.
অর্থাৎ এরপর কোনো কাপড় দিয়ে তার শরীর মুছে দিবে। (কিতাবুল আছল ১/৩৪৭)
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন সাহাবীকে জান্নাতের পানি দ্বারা গোসল করিয়েছেন- এ কথাই ঠিক নয়। হাদীসের কিতাবে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না; বরং হাদীস শরীফে এসেছে, হামযা ও হানযালা রা. গোসল ফরয অবস্থায় যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সম্পর্কে বলেছেন-
رَأَيْتُ الْمَلَائِكَةَ تُغَسِّلُهُمَا.
‘আমি তাদের দুজনকে ফেরেশতাদের গোসল করাতে দেখেছি।’ (আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ১২০৯৪)
-কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মাদীনাহ ১/২২৫; আলমাবসূত, সারাখসী ২/৫৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/২৬; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২১৯
১৬৯৫. প্রশ্নঃ
সাধারণত পুরুষদের লাশে সুগন্ধি লাগানো হয়। এখন জানার বিষয় হল, মহিলাদের লাশেও কি সুগন্ধি লাগানো যাবে?
উত্তরঃ
হ্যাঁ, মহিলাদের লাশেও সুগন্ধি ব্যবহার করা মুস্তাহাব।
-মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৪১৬; শরহুল মুনইয়্যাহ পৃ. ৫৭৯; হাশিয়াতুত্তাহতাবী আলাদ্দুর ১/৩৬৭; আননাহরুল ফায়েক ১/৩৮৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৬১; আলবাহরুর রায়েক ২/১৭৩
একটি অনুচিত কাজ : কালিমা বা আয়াত খচিত কাপড় দ্বারা মায়্যেতের খাটিয়া ঢাকা
বিভিন্ন এলাকায় একটি বিষয় লক্ষ করা যায়। তা হল, মায়্যেতকে খাটিয়ায় রাখার পর কালিমা বা কুরআনের আয়াত খচিত কাপড় দিয়ে খাটিয়া ঢেকে দেওয়া হয়। এমন করা উচিত নয়। এর দ্বারা কালিমা বা কুরআনের আয়াতের অপব্যবহার হয়। এক্ষেত্রে সাধারণ চাদর দিয়ে ঢাকবে, কালিমা বা আয়াত খচিত কাপড় দ্বারা ঢাকবে না।
অনেক এলাকায় মসজিদের পক্ষ থেকে যেমন খাটিয়ার ব্যবস্থা থাকে তেমনি সাথে সাথে কালিমা বা আয়াত খচিত কাপড়ও থাকে, ফলে মানুষ মনে করে, এটা দিয়েই ঢাকা উচিত। মসজিদ কর্তৃপক্ষের বিষয়টি খেয়াল রাখা চাই। তারা যদি কাপড়ের ব্যবস্থা রাখতেই চান তাহলে সাধারণ কাপড় বা চাদরের ব্যবস্থা রাখতে পারেন।
৪০৭২. প্রশ্নঃ
কোনো মুসলমানকে দাফন করার জন্য কোন তরীকায় কীভাবে কতুটুকু কবর খনন করবে? কবর খননের সুন্নত তরীকা কী, জানালে উপকৃত হব।
উত্তরঃ
যেসব জায়গার মাটি শক্ত ও মজবুত সেসব জায়গায় লাহদ (বোগলী) কবর খনন করা সুন্নত। সেটা হল-স্বাভাবিকভাবে চার কোণা করে মাটি খোড়ার পর নীচে পশ্চিম (কিবলার) দিক দিয়ে একটি গর্ত করবে এবং পশ্চিম দিকের ঐ গর্তের মধ্যে লাশ রাখবে।
আর যেসব জায়গার মাটি নরম, লাহদ কবর করলে মাটি ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা আছে, সেসব জায়গায় সিন্দুক কবর করবে। অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে চার কোণা করে মাটি খোড়ার পর নীচের দিকে গিয়ে মাঝ বরাবর একটি গর্ত করবে এবং সেখানে লাশ রাখবে।
আর কবরের গভীরতা সর্বনিম্ন নাভি পর্যন্ত থেকে সর্বোচ্চ একজন মধ্যম গড়নের ব্যক্তি দু’হাত উপরে তুলে দাঁড়ালে যতটুকু লম্বা হয় ততটুকুর মধ্যে রাখবে। তবে উপরের পরিমাণের মধ্যে যে এলাকায় যেটা প্রচলন সে এলাকায় সে পরিমাণই গভীর করা উচিত।
আর কবরের দের্ঘ্য হবে মৃতের দৈর্ঘ্য সমান এবং প্রস্থ হবে দৈর্ঘ্যরে অর্ধেক বা তারচেয়ে কিছুটা কম।
-সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯৬৬; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ১১৭৮৩, ১১৭৮৪, ১২১৭৭ হালবাতুল মুজাল্লী ২/৬২২; আলবাহরুর রায়েক ২/১৯৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৬৬; রদ্দুল মুহতার ২/২৩৪
২৩২৬. প্রশ্নঃ
আমাদের এলাকায় কবরে লাশ রেখে প্রায় ২ হাত উঁচুতে বাঁশ দেওয়া হয়। লোকদের ধারণা, সওয়াল-জওয়াবের জন্য মুর্দাকে যখন বসানো হবে তখন বসতে গিয়ে যেন মাথা বাঁশে না লাগে। ভালোভাবে যেন বসতে পারে। আর গভীরতার ক্ষেত্রে কেউ বেশি গভীর করে কেউ কম। তাই জানতে চাই, ক) কবরের গভীরতার পরিমাণ কতটুকু হওয়া উচিত? খ) মুর্দা বসতে পারে এ পরিমাণ কবরে ফাঁকা রাখা ঠিক কি না?
উত্তরঃ
ক) কবরের গভীরতা এ পরিমাণ হওয়া উচিত যেন লাশের দুর্গন্ধ না ছড়াং এবং হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকেও লাশ হেফাযত থাকে। তাই অন্তত কোমর পরিমাণ গভীর করা উচিত। সম্ভব হলে পূর্ণ দেহ পরিমাণ গভীর করা উত্তম। খলীফাতুল মুসলিমীন উমর রা. ইন্তেকালের আগে তাঁর কবর একজন মানুষের দেহের দৈর্ঘ্য পরিমাণ গভীর করার অসিয়ত করেছিলেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৭/৩২৪)
খ) কবরে শায়িত ব্যক্তিকে বসানো, সওয়াল-জওয়াব করা এসব বরযখ নামক এক অদৃশ্য জগতে হবে। কাফন-দাফনের বিধানাবলির সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তাই বরযখে মাইয়্যিত কিভাবে বসবে, ফেরেশতারা কোথায় থাকবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবার প্রয়োজন নেই। আল্লাহর হুকুম ও কুদরতেই এসব কিছু হবে। সুতরাং কবরে বেশি ফাঁকা না রেখে বাঁশগুলো লাশের কাছাকাছি রাখা নিয়ম।
-শরহুল মুহাযযাব ৫/২৫১; আলমুগনী ৩/৪২৬; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৯০; রদ্দুল মুহতার ২/২৩৩; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলালমারাকী ৩৩; ইমদাদুল আহকাম ১/৮৩৯; খায়রুল ফাতাওয়া ৩/১৫৩
৪৫০৪. প্রশ্নঃ
আমাদের গ্রামে একজন প্রসিদ্ধ কবর খননকারী আছে। নির্ধারিত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সে কবর খুঁড়ে থাকে। প্রয়োজন হলে আশপাশের গ্রাম থেকেও তার ডাক আসে।
প্রশ্ন হল তার জন্য এভাবে পারিশ্রমিক নিয়ে কবর খনন করা এবং তাকে দিয়ে টাকার বিনিময়ে কবর খনন করানো কি জায়েয হবে?
উত্তরঃ
কবর খনন করা সওয়াবের কাজ। যে এ কাজ করে সে তো সওয়াবের উদ্দেশ্যেই করে। তবে এক্ষেত্রে কেউ যদি তাকে হাদিয়া দিয়ে ইকরাম করে তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েয আছে। আর যেখানে এ কাজের জন্য একাধিক ব্যক্তি রয়েছে সেখানে কেউ যদি নির্ধারিত পারিশ্রমিক নিয়ে এ কাজ করতে চায় তবে সেটিও নাজায়েয নয়। তবে এমন না করাই ভালো।
-বাদায়েউস সানায়ে ৪/৪৫; ফাতাওয়া কাযীখান ১/১৯০; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৮/১৫৬; আদ্দুররুল মুখতার ২/১৯৯
৩৬৩২ . প্রশ্নঃ
আমার গ্রামের বাড়ি খুলনার বাগেরহাটে। আমার প্রশ্ন হল, আমাদের এলাকার সামাজিক কবরস্থানটা মুর্দা দাফন দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। এখন কি এ কবরস্থানে মাটি সংস্কার করে আবার মুর্দা দাফন করা যাবে? এ বিষয়টি নিয়ে এলাকায় মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। কেউ বলছে, কবরস্থানে মাটি সংস্কার করে আবার দাফন করা যাবে। আবার কেউ বলছে, এখন প্রত্যেকে নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানের ব্যবস্থা করে সেখানে দাফন করবে। দয়া করে এ বিষয়ে শরীয়তের হুকুম জানিয়ে বাধিত করবেন। আমরা শরয়ী সমাধানের প্রতীক্ষায় আছি।
উত্তরঃ
কবর পুরাতন হওয়ার কারণে লাশ মাটি হয়ে যাওয়ার প্রবল ধারণা হলে সেখানে নতুন কবর দেওয়া জায়েয আছে। তাই প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনাদের ঐ কবরস্থানের পুরাতন কবরের এলাকায় সংস্কার করে সেখানে নতুন করে কবর দেওয়া যাবে। অবশ্য কবর খননের সময় সেখানে কোনো হাড্ডি ইত্যাদি পাওয়া গেলে তা কবরের এক পাশে বা ভিন্ন স্থানে দাফন করে দিবে।
তবে কম সময়ের কবর, যেগুলোতে লাশ মাটি হয়ে যাওয়ার প্রবল ধারণা হয়নি সেখানে বিশেষ ওজর ছাড়া নতুন করে কবর দেওয়া যাবে না।
-তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/৫৯৯; আলবাহরুর রায়েক ২/১৯৫; রদ্দুল মুহতার ২/২৩৩
৪৫০৩. প্রশ্নঃ
আমাদের এলাকায় জানাযার খাটিয়া বহন করার সময় লোকজন উচ্চস্বরে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ও বিভিন্ন কালিমার যিকির করে। কয়েকদিন আগের ঘটনা। এক জানাযার খাটিয়া নেওয়ার সময় লোকজন সমস্বরে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর যিকির করছিল। এ দেখে আমাদের নতুন ইমাম সাহেব বললেন যে, এভাবে উচ্চস্বরে কালিমা পড়া বিদআত। এ কথা বলতেই কিছু লোকজন ইমাম সাহেবের উপর খেপে যায়। তাদের কথা হল, কালিমা পড়ছি এখানে বিদআতের কী হল? এ নিয়ে বেশ ঝামেলা সৃষ্টি হয়।
তাই মুফতী সাহেবের কাছে জিজ্ঞাসা হল, এ ব্যাপারে কুরআন-হাদীসের নির্দেশনা কী? এবং এক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের আমল কী ছিল? বিস্তারিত দলিল-প্রমাণসহ জানানোর জন্য বিশেষ অনুরোধ রইল।
উত্তরঃ
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম জানাযা বহনের সময় চুপ থাকতেন। আখেরাতের বিষয়ে চিন্তামগ্ন থাকতেন। ইবনু জুরাইজ রাহ. বলেন-
أَنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ كَانَ إِذَا تَبِعَ الْجِنَازَةَ أَكْثَرَ السّكُاتَ، وَأَكْثَرَ حَدِيثَ نَفْسِهِ.
নবী কারীম সাল্