24/07/2022
ঢাকা কলেজের উল্টাদিকে গেছি জামাকাপড় কিনতে। সিঁড়ির দোতলায় অনেক দর্জি বসেন, সেলাই মেশিন নিয়ে।এনারা কাস্টমার পেতে ডাকাডাকি করেন, ভাই আসেন কি লাগবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি খুঁজছিলাম লম্বা,পাতলা অফিস মোজা, কালো রঙের। বিচিত্র কারণে ওইদিন এটা পাওয়া যাচ্ছিলো না, পেলেও সাইজ মেলেনা। দশ জায়গা ঘুরে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, প্রচন্ড গরমে আমি আর আমার স্ত্রী দুজনই ঘামছি দরদর করে। হঠাৎ সিঁড়ির উপর থেকে টুপিদাড়িওয়ালা একজন দর্জি ডাক দিলেন, "স্যার, কি খুঁজেন? জামাকাপড় বানাবেন? আমার কাছে আসেন।" বললাম, জামাকাপড় বানাবো না, পায়ের মোজা খুঁজছি। উনি হেসে বললেন, উপরে উঠে তিন তালায় কোনার দোকানে চলে যেতে। গেলাম, এবং মোজা পেলাম (হুবহু যা চেয়েছিলাম পাইনাই, কিন্তু কাজ চলে)।নামার সময় ভদ্রলোকের সাথে দেখা হল, নাম জানতে চাইলাম। বললেন, উনার নাম মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
এই ভদ্রলোকের কথা লেখার কারণ হচ্ছে, আমি উনার কাস্টমার না, কিন্তু তাতেও তিনি সার্ভিস দেয়া বন্ধ করেন নাই। নিজে থেকে ডেকে আমাকে তথ্য দিয়ে হেল্প করেছেন। শুধু তাই না, বলেছেন কিছু লাগলে যেন উনাকে জানাই, উনি না পারলে বলে দেবেন কোথায় পাবো। তাঁর চোখেমুখে একটা অদ্ভুত আন্তরিকতা আছে, যেটা আপনাকে স্পর্শ করবে। এটা তখনই আসে যখন কেউ সত্যি সত্যি নিজের কাজটাকে ভালবাসে।
উনার নিজের দোকান নেই, সিঁড়ির পাশে একটা চেয়ার আর একটা সেলাই মেশিনই তাঁর সম্বল। কিন্তু উনি উনার পেশাকে own করেন, যে মার্কেটে কাজ করেন সেই মার্কেটটাকে own করেন। এই কারণে তিনি একজন অপরিচিত নন-কাস্টমারকে হেল্প করেছেন। তিনি বোঝেন, মার্কেটে মানুষ আসলে এমনিতেই এক সময় না এক সময় তাঁর নিজের কাছেও কাস্টমার আসবে।
আর কিছু না হোক, হয়ত একজন ভালোমানুষ হিসেবে কোনো কারণ ছাড়াই তিনি হেল্প করেছেন। তবু, কাস্টমার হিসেবে আমার মনে দাগ কেটেছে ব্যাপারটা।
জাপানের কোনো দোকানে গেলে "ইরাশেমাসে" বলে যেভাবে স্বাগতম জানায়, মনে হয় আমি এই দোকানের মালিক। আমেরিকায় অতটা না, কিন্তু গেলে মনে হবে কর্মচারীরা সব আমার ভাই ব্রাদার।
এবছর দেশে আসার আগে ল্যাপটপের চার্জার কিনতে গেছি। দুজন সেলসম্যানের একজন আরেকজনকে একটা চাবি ছুঁড়ে দিলো, সে ঈগলপাখির ক্ষিপ্রতায় ওটা ক্যাচ ধরলো। দৃশ্যটা এত ফানি যে গিয়ে বললাম, ভাই, তুমি ক্রিকেটে উইকেট কিপার হলে অনেক নাম করতে। ক্রিকেটের নাম শুনেছ? ছেলেটার নাম রন, মুখে হাসি লেগেই আছে। বললো, "ভাই, ক্রিকেট খেলার নাম শুনেছি, আমার অনেক ইন্ডিয়ান বন্ধু আছে। তবে তুমি যে বললা আমি অনেক ফাস্ট, ব্যাপারটা তা না। আমার হাইট পাঁচ ফিটও হবেনা, আর তুমি সম্ভবত ছয় ফুটের উপর। কাজেই, "your one step is my two step"।মানে হইলো, তুমি এক পা ফেলতে ফেলতে আমি দুই পা ফেলি, এইজন্য আমার মুভমেন্ট এত ফাস্ট মনে হয়।
ওর কথা শুনে আমি হাসতে হাসতে শেষ! বের হবার সময় ম্যানেজারকে বললাম, রন ইজ অসাম!
অথচ কোনো "দেশি" (উপমহাদেশীয় অর্থে) দোকানে গেলে জিনিসপত্র দেখতে ভয় লাগে।দেখে যদি পছন্দ না হয়, যদি না কিনি, কেউ কেউ প্রচন্ড দুর্ব্যবহার করে। সিঙ্গাপুরে এক শিখ দোকানে টিশার্ট কিনতে গিয়ে হাতাহাতি হবার মত অবস্থা। সবাই এরকম নন, এক দুইজনকে দিয়ে সবাইকে বিচার করাটাও ভুল। তবে আমার মনে হয়েছে, আচার আচরণের ক্ষেত্রে আমাদের উন্নতি করার বহু, বহু সুযোগ রয়েছে।
কাস্টমারের সাথে ভাল আচরণ করা সকল সৎ ব্যবসায়ীর মঙ্গল হোক, আল্লাহ তাদের ব্যবসায় বেশি বেশি বরকত দিন এই দোয়া করি।