05/10/2025
ঘটনা শুরু হয় সাড়ে ১২টা থেকে। রংপুর জিলা স্কুল, গার্লস স্কুল, পুলিশ লাইন, ক্যান পাবলিক এই কয়েকটা স্কুল কলেজের স্টুডেন্টরা মিলে মিছিল বের করি।
নির্দেশনা ছিল কারমাইকেল কলেজের সামনে যে মিছিলটা আছে, ওইটার সাথে গিয়ে যুক্ত হওয়া। অনেক বাধাবিপত্তির পর দুপুর ২টার দিকে আমরা গিয়ে পৌছাই। কারমাইকেল কলেজের সামনে, ওই মিছিলটার লিড দিচ্ছিলো আবু সাইদ ভাইয়া।
তো ভাইয়া আমাদেরকে সেখানে নির্দেশনা দেয় যে, এরপর আমাদের কর্মসূচিটা কি রকম হতে যাচ্ছে। ভাইয়া আমাদেরকে বলে, আমরা ভার্সিটির সামনে যাব। ভার্সিটির সামনে গিয়ে আমরা কোনোকিছু করবো না, জাস্ট অবস্থান করে স্লোগান দিব, আর আমাদের দাবিটা জানাব। তো আমরা স্টুডেন্টরা তো ওটারই জন্য আসছিলাম। কারো ক্ষতি করবো না, নীরবভাবে আমাদের দাবিটা জানাব।
তখন মিছিলে মানুষ গোনা যাচ্ছিল না, এত মানুষ! আমাদের মিছিলটা মোটামুটি ছোট ছিল, মেয়ের সংখ্যাও কম ছিল। বাট ওই মিছিলটা দেখে মনে হচ্ছিল যে, না, আমরা যেই কাজটাতে আসছি সেটা ঠিক, নাহলে এত মানুষ তো আসতো না! আমি ভুল করলে কি সবাই ভুল করবে? এত মানুষ একসাথে ভুল করে? মিছিলটা দেখে মনে ইয়া আসলো যে, না, একটা ভালো কিছুর জন্য আসছি, ভালো কাজের জন্য আসছি। অনুপ্রেরণা পাই। ভাইয়া (আবু সাইদ) অনেক কথা বললো। ভাইয়ার কথাগুলো আসলে অনেক ইন্সপিরেশনাল ছিল।
বললো যে, আমরা তো আমাদের দাবিটা জানাইছি। আমরা তো কোনো অনধিকার চাই নাই। আমাদের দাবি তো যথার্থই দাবি। কারো অধিকার তো ছিনাই নিতে চাই নাই। আমি পড়াশোনা করবো, আমি ভালো জায়গায় যাব, এটা তো আমার অধিকার। আমাকে কেন অন্যকারো সাহায্য নিয়ে যাইতে হবে?
আমাদের মেইন ইয়াটা ছিল কি, ১৫ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এটাক করা হইছিল, ওই এটাকের প্রতিবাদও আমাদের কর্মসূচিতে ছিল। ভাইয়া ওইটাই বলছিল, ‘আপনাদের সাথে যদি আমাদের মতের মিল নাও হয়, আপনারা তো এটাক করতে পারেন না, স্টুডেন্টদেরকে এভাবে হলছাড়া করতে পারেন না। হলে থাকা স্টুডেন্টদের একটা অধিকার। এতগুলা স্টুডেন্টের গায়ে যে হাত উঠাইলেন, এতগুলা স্টুডেন্ট যে আহত হইল, তার দায়ভার কে নিবে?’ এভাবে ভাইয়া আমাদেরকে অনেক ইন্সপিরেশনাল কথা বলছে।
পুরো মিছিলটা আগাচ্ছিলো বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। আমাদের পিছনের সারিতে আবু সাইদ ভাইয়া, তারপর ছেলেদের ভীড়, তারপর মেয়েদের ভীড়। যখন ভার্সিটি গেইটের সামনে যাই, তখন ভাইয়া আমাদেরকে নির্দেশনা দিলো, ‘সবাই অনেকদূর হেঁটে আসছো, একটু রেস্ট নাও। তারপর আমরা এখানে স্লোগান দিব।’
আমরা জাস্ট ওখানে বসছি, ১ নাম্বার গেইটের সামনে, এখন আবু সাইদ চত্বর বর্তমানে যেটা, ছেলেরা পুরো রাস্তা ব্লক করে বসছে, আর মেয়েরা সাইডে গিয়ে বসছে। আমার মনে আছে, এত রাস্তা হেঁটে এসে সবাই ক্লান্ত হয়ে গেছিল। সবাই পানির জন্য হাহাকার করতেছিল। আমি অলওয়েজ পানি ক্যারি করি, সো পানি দিচ্ছিলাম। সবাইকে পানি খাওয়ানোর পর আমি যখন পানি খাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ করে, বসিও নাই আমি, ফায়ারিং শুরু করে পুলিশ। কোনোকিচ্ছু নাই, জাস্ট ব্রাশফায়ার করে।
মানে কে কোথায় গেল না গেল এটা দেখার কোনো বিষয় নাই। কার লাগুক আর না লাগুক এটাও দেখতেছে না, জাস্ট ফায়ার করতেছে। কেউ যদি আপনাকে আক্রমণ করে, আপনি ন্যাচারালি ডিফেন্স করতে চাবেন, তো ছেলেদের হাতে যাদের লাঠি ছিল, যার যা ছিল ওইগুলা নিয়ে ইয়া করতেছিল। তখনো আবু সাইদ ভাইয়া বলতেছিল যে, তোমরা কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ো না। পুলিশ যাই করুক, তোমরা কেউ লাঠিচার্জ কইরো না। কেউ ইটপাটকেল মারবা না।
যখন ফায়ারিং শুরু হয়, আমি দৌড়াচ্ছিলাম। দৌড়ানোর সময় আমার গুলি লাগে। আমি আমার এক ফ্রেন্ডের বাসায় আশ্রয় নিই। ওই বাসায় থাকতে থাকতেই শুনলাম আবু সাইদ ভাইয়া শহিদ হইছে।
- মিফতাহুল জান্নাত মিতা (রংপুর)