22/10/2025
#নূরে_জাহান
#রেজওয়ানা_রিফা
#পর্ব_০৫
সেদিন বিকেলে জাহান মঞ্জিলের উঠোনে হালকা রোদের ছায়া পড়েছে। বাতাসে কাঁঠালপাতার গন্ধ, কোথাও দূরে বউরানির হাঁক শোনা যায়। নূর লাল ফ্রক পরে পুতুল নিয়ে খেলছে দাদার পায়ের কাছে। ছোট্ট মুখে হাসি, চোখে আলো—যেন তার চারপাশের পৃথিবীটাও নূরের মতো সরল।
ঠিক সেই সময়ে বাড়ির ফটকে থামলো এক জিপ। অনেকদিন পর ফিরে এসেছেন ইউসুফ আলী খানের শৈশবের বন্ধু হামিদ রহমান।
দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি সৌদি আরবে নিজের ব্যবসা করেন—খেজুর, পারফিউম আর গিফট আইটেমের বড় দোকান তার জেদ্দায়। এক কথায় বলা যায় সফল ব্যবসায়ী। গ্রামেও তাদের ব্যবসা বাণিজ্য আছে যেগুলো তার ভাইরা দেখাশোনা করেন।
ইউসুফ আলী খান ছুটে গিয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরলেন—
“হামিদ! তুই এলি রে! কবে ফিরলি?”
হামিদ হেসে বললেন,
“তোরে না দেখে মন টিকছিল না বন্ধু।খুব মনে পড়ছিল গ্রামের বাড়ির কথা। ভাবলাম, একটু সময় পেলে পুরনো বাড়িটা দেখি, তোদের দেখি।”
বাড়ির উঠোনে দাওয়াতের মতো বসে পড়লো দুজনের গল্প। দুধ–চা, মুড়ি, কলা, আর হাসির ফোয়ারা। পুরনো দিনের কথা, স্কুলের গল্প, মাঠে বল খেলা—সব যেন নতুন করে ফিরে এল।
এমন সময় দৌড়ে এলো ছোট্ট নূর। হাতে কাঠের পুতুল, মুখে মিষ্টি হাসি। সে দাদার পাশে বসে পুতুলের চুল আঁচড়াচ্ছে।
হামিদুর তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর আস্তে বললেন—
“এই মেয়েটা কি তোর?”
ইউসুফ গর্বভরে হেসে বললেন—
“হ্যাঁ, আমার নূরে জাহান। এখন ছয় বছর বয়স। পুরো বাড়িটা ওর হাসিতেই বেঁচে আছে।”
হামিদের মুখে নরম হাসি ফুটল।
ইউসুফ নূরকে ডেকে বললেন,
“আয় মা, এই চাচাকে সালাম কর।”
নূর মিষ্টি গলায় বলল, “আসসালামু আলাইকুম চাচা।”
সেই কণ্ঠ শুনে হামিদ রহমানের চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা ফুটে উঠলো। শিশুর নিষ্পাপ মুখটা যেন তার মনে স্থায়ী দাগ ফেলে গেল।
ইউসুফ তার পরিবারের সবাই কেমন আছেন তার ব্যবসার বর্তমান অবস্থায় বা কি তা জানতে চাইলেন।
হামিদ বলতে লাগলেন—
“তোকে আমি শুধু বন্ধু বলি না, তুই আমার ভাইয়ের মতো। আমি সৌদিতে এখন নিজের ব্যবসা চালাই, আলহামদুলিল্লাহ ভালোই আছি। আল্লাহর রহমতে দুই এক ছেলে নিয়ে ভালো কাটছে আমার দিন।জানিস এত দিন তো শুধু ছেলের বাবা ছিলাম তবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমার ঘরে এক মেয়ে দিয়েছেন, তিন মাস হলো জন্মেছে।”
এই সব বলেই হামিদ রহমান খুশিতে গদগদ করতে লাগলেন।
ইউসুফ শুনে একটু অভিমানের সুরেই বলল, “ কি তোর মেয়ে হয়েছে..? মাশা আল্লাহ। তবে তুই এতোই স্বার্থপর যে একবারও খবর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলি না। যা আর কথা বলতে হবে না আমার সাথে।”
হামিদ রহমান হেসে বললেন “ যা বেটা স্বার্থপর কি শুধু আমি একা?? তুই এত স্বার্থপর।তুই নিজেও মেয়ের বাবা হয়েছিস সেটা তো আমাকে জানাস নি। একদম ৬ বছর পর মেয়ে ডেকে বলছিস এটা আমার মেয়ে।”
এই সব খুনসুটি করতে করতে দুই বন্ধু আনন্দে মেতে উঠলো।
তবে সহসা হামিদ রহমান বলে উঠলেন “ শোন ইউসুফ তুই যদি কিছু মনে না করিস একটা কথা বলি..?”
“-হ্যাঁ বল না.।”
“-তোর মেয়ে নূরের সাথে আমি আমার বড় ছেলের বিয়ে দিতে চাই। তারা যখন বড় হবে তখন আমরা তাদের বিয়ে দিব। আমাদের বন্ধুত্ব সম্পর্কটা আরো গাঢ় হবে। তুই কি বলিস.?”
ইউসুফ প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন—
“এত ছোট বাচ্চা নিয়ে এখনই এমন কথা ভাবছিস?”
হামিদুর হেসে বললেন,
“বন্ধু, আজ যা মনে হয়েছে, সেটা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া হয় না। তোর মেয়ের মুখে আমি যে আলো দেখেছি, সেটা সাধারণ নয়। তোর ইচ্ছে থাকলে আজই এই প্রতিশ্রুতি থাক।”
ইউসুফ আলী খান কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বললেন—
“তুই আমার প্রাণের বন্ধু, তোর ইচ্ছা আমার কাছে দোয়ার মতো। দেখা যাক, ভবিষ্যতে আল্লাহ কী ঠিক করে রাখেন।”
নূর তখন কিছুই বোঝে না। সে শুধু পুতুলকে কোলে নিয়ে হাসছে, মাঝে মাঝে বলে উঠছে—
“চাচা, আমার পুতুলেরও বিয়ে হবে!”
দুজন বন্ধুর চোখে একরাশ আনন্দ, কিন্তু সেই হাসির নিচে ভাগ্যের এক নতুন গল্পের শুরু হয়ে গেল—
একটি ছোট প্রতিশ্রুতির, যা একদিন নূরের জীবনের রঙ বদলে দেবে…
#চলবে…