26/04/2025
বুঝলে বৌমা তোমার আর ইলিশ খেয়ে কাজ নেই| এমনিতেই তো খেতে ঘন্টাদুয়েক সময় লাগাও, তার ওপর আবার ইলিশের কাঁটা! বাছতে নির্ঘাত ঘন্টাখানেক সময় বেশি লাগাবে| ততক্ষণে বোধহয় আমাদের ঘন্টুটা স্কুল থেকে এসে পড়বে| আর বাড়িতে পা দেওয়া মাত্রই তোমার ছেলের গুন্ডামি শুরু হয়, ওই তান্ডব সামলানোর জোর এই বুড়ো হাড়ে অবশিষ্ট নেই| আমি কি বলি তাড়াতাড়ি খেয়ে মাছদুটো বরং রবি আর ঘন্টুর জন্য রেখে দাও, রাতের বেলা একটু গরম ভাত করে দিও, দুজনে তৃপ্তি করে খেতে পারবে| বাব্বা! আজকাল ইলিশের যা দাম!
শাশুড়ির কথার কোন জবাব না দিয়ে সর্ষে ইলিশের বাটিটা অদিতি নিজের পাতের দিকে টেনে নিল|
কি হল বৌমা, মনে হচ্ছে কথাটা তোমার কানে গেল না? নাকি বুড়োমানুষ বলে আমার কথাটা গ্ৰেরাহ্যি হল না?
ইলিশের সুক্ষ কাঁটা ছাড়াতে ছাড়াতে হাল্কা হাসল অদিতি, প্রত্যেকে নিজের নিজের ভাগটুকু পেয়ে গেছে মা| এক্সট্রা পাওয়ার তো কোন কারণ দেখছি না| এই দুটো পিস আমার ভাগের| আমি নিজের ভাগটুকুই খাচ্ছি|
সব সময় নিজের ভাগ দেখিও না বৌমা| আমার আর কি? ছেলেটা, নাতিটা ইলিশ হলে দু গাল ভাত বেশি খায়, তাই বলছিলাম| তোমার মনে যে এত ভাগাভাগির হিসাব কষা আছে তা তো জানা ছিল না| খাও, খাও, প্রাণ ভরে ইলিশ খাও| বাপের বাড়িতে তো ভাতের পাতে চুনোমাছটুকুও জুটত না, এখন বরের পয়সা দেখেছ, খাও ধ্বংস করে যা ইচ্ছে তাই খাও|
আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন মা এই সংসারের উনকোটি কাজ কিন্তু আমিই করি| সেই হিসেবে যদি আমায় এতদিনকার মাইনে দিতে হয় তবে আপনার ছেলের তথাকথিত বিশাল আয়েও কুলিয়ে উঠতে পারবে না, হয়ত আপনাদের ভদ্রাসনটুকুও কম পড়বে! যাক ছাড়ুন সেসব| আমায় শান্তিতে একটু খেতে দিন|
কি? কি বললে তুমি বৌমা? রাজেশ্বরী প্রায় তুতলে উঠলেন, আমার ছেলে এত রোজগার করেও তোমার মাইনে দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারবে না! কর তো রোজকার ঘরের কাজ| আমরাও বিয়ের পর থেকে আজ অবধি সংসার সামলাচ্ছি| এমন কি বিশেষ কাজ কর তুমি যে তোমাকে আলাদা করে মাইনে দিয়ে পুষতে হবে?
তাহলে একটু বিস্তারিত বলি| মন দিয়ে শুনুন| অদ্ভুত এক হাসি হেসে শুরু করল অদিতি, সকাল হতে না হতেই ঘুম থেকে উঠে কোমর বেঁধে কিচেনে লেগে পড়তে হয়| সময়মত সকলের পছন্দের চা-জলখাবার থেকে শুরু করে দুপুরের লাঞ্চ, অফিস-স্কুলের পছন্দসই টিফিন বিকেলের হাল্কা টুকটাক স্ন্যাকস, রাতের ডিনার : সবচাইতে কম হলে মিনিমাম চার হাজার, চাইলে মার্কেট রেট যাচাই করে নেবেন, তার মাঝে আপনার ছেলের কাজের অকাজের ফোন টোন এলে ধরা : হাজার, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, মোছা : তিন হাজার, প্রতিদিনের বাজার, রেশন, দোকানের ফর্দ মিলিয়ে মাল আনা নেওয়া : দু হাজার, ছেলেকে পড়ানো : পাঁচ হাজার, প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা ( গাড়িভাড়া সমেত ) : তিন হাজার, আপনার দেখাশোনা, ব্যথা হলে তেল মালিশ : দু-হাজার, ইলেকট্রিক বিল, ট্যাক্স, কেবিল, ব্যাঙ্কের, পোস্টাপিসের যাবতীয় কাজকর্ম : পাঁচ হাজার... মাস জুড়ে যেন কত হল মা? ভাল কথা, কতগুলো কাজ তো ধরতেই ভুলে গেছি : রোজকার জামাকাপড় শুকনো করা ও তোলা, আয়রন করা, ছেলের স্কুলের টিচার্স-স্টুডেন্ট মিটিং অ্যাটেন্ড করা... যাক এগুলো না হয় ছেড়েই দিলাম, কনসোলেশন প্রাইজ| কিন্তু বাকিগুলো? সম্মান রক্ষার্থে সারাবছরের কয়েকখানা পোশাক আর একটা বাৎসরিক ট্যুর ছাড়া আপনার ছেলে এই পাঁচ বছরে আমাকে আর কি দিয়েছে আপনিও তা ভাল করে জানেন! তাহলে পাঁচ বছরের হিসেবটা ঠিক কত যেন হচ্ছে মা? আপনি তো বেশ ভাল পাটিগণিত জানেন... জানেন না বলুন?
তুমি... তুমি শেষে কিনা নিজেকে একটা কাজের লোকের সঙ্গে! তুমি তো এ বাড়ির কর্ত্রী, কি বলবেন কথা খুঁজে পান না রাজেশ্বরী|
কর্ত্রী? হাসল অদিতি| ভাল একটা গালভরা শব্দ বললেন তো মা| বাড়ির কর্ত্রীর পাত থেকে কি কেউ ইলিশের পিস তুলে রাখার কথা বলতে পারে? নাকি কারুর সেই সাহস হয়?
উত্তর না দিয়ে ধীরপায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন রাজেশ্বরী| এ যুগের মেয়ে হয়ে জন্মান নি বলে আজ তাঁর ভারী আফসোস হতে লাগল| এই যুগের মেয়েরা সংসার সামলাতে জানে, লড়তেও! এরা জানে কি চায় এরা, নিজের দাবী আদায় করতে লজ্জিত নয়, সোচ্চার| সেদিন যদি তিনি ভয় না পেয়ে শাশুড়ির কথার যোগ্য প্রত্যুত্তর দিতে পারতেন তাহলে হয়ত প্রতিদিন দুপুরে চোখের জল দিয়ে মেখে শাকচচ্চড়ি আর ভাত খেয়ে উঠতে হত না!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সর্ষে ইলিশের ঝোলটা দিয়ে ভাত মাখতে লাগল অদিতি| লজ্জাবশত এতদিন চুপ করে থাকলেও আজ অন্ততঃ সে নিজের স্বাধীন মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা লাভ করতে পেরেছে| তার কাছে এই দিনটাই আসল স্বাধীনতা দিবস| অন্ততঃ আজ থেকে আর কেউ তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার সাহস দেখাবে না|
সংগৃহীত।