12/08/2026
আজ ২৮ সফর। রাসূল সা. এর প্রিয় নাতি, জান্নাতের যুবকদের অন্যতম নেতা হাসান বিন আলী রা. এর শাহাদাত দিবস। অনেকেই যে তথ্যটি সেভাবে জানেন না, তাহলো, খোলাফায়ে রাশেদুনের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী ইবনে আবু তালিব রা. এর শাহাদাতের পর পরবর্তী ৬ মাস এই হাসান ইবনে আলী রা. খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
সে সময় মুসলিম সমাজ গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ছিল। সিরিয়ার শাসক মু‘আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান হজরত আলীর জীবদ্দশায় তার খেলাফতের আনুগত্য করেননি। হাসান ইবনে আলী রা. দায়িত্ব নেয়ার পরও তার এই অসহযোগিতা অব্যহত থাকে। এমতাবস্থায় হাসান রা. দেখলেন, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক রক্তপাত হবে। তাই তিনি মু‘আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের সঙ্গে একটি চুক্তি সাক্ষর করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা ছেড়ে দেন এবং মদিনায় ফিরে আসেন।
রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নেতৃত্ব ছেড়ে দিলেও তাকে সবসময়ই হুমকি হিসেবেই গন্য করা হতো। কারণ সাধারণ মুসলমানদের ভেতর তার ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা ছিল। তাই ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় তার স্ত্রী জা‘দা বিনতে আশ‘আসকে। আকর্ষণীয় প্রলোভন দিয়ে তাকে দিয়েই বিষ খাওয়ানোর পরিকল্পনা করা হয়।
সেই মোতাবেক একদিন হাসান রা.-এর জন্য খাবার পরিবেশন করা হলো। সেই খাবারে বিষ মেশানো হয়েছিল। হাসান রা. খাবার গ্রহণ করার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আক্রান্ত হলেন। বিষ তাঁর শরীরের ভেতরে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। তাঁর অসুস্থতা দীর্ঘায়িত হলো। প্রায় চল্লিশ দিন তিনি বিষের যন্ত্রণা সহ্য করেন। এই সময় তাঁর ছোট ভাই হুসাইন রা. সবসময় তাঁর পাশে ছিলেন।
সুন্নী ইতিহাসে বলা হয়, হুসাইন রা. বারবার বিষদাতার নাম জানতে চাওয়ার পরও হাসান রা. কিছু বলেননি। শিয়া সাহিত্যে দাবি করা হয়েছে, হাসান রা. তার ভাইকে ষড়যন্ত্রকারীদের বিস্তারিত বলে গিয়েছিলেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুর আগে কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেননি। কেননা, তার শাহাদাত কেন্দ্র করে তিনি মুসলমানদের ভেতর আর রক্তপাত চাননি।
জীবনের শেষ ওসিয়াত হিসেবে হাসান রা. মসজিদে নববিতে তার প্রিয় নানাজান, রাসূল সা. এর পাশে সমাহিত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মদিনার তদানীন্তন শাসক ও নীতি নির্ধারনী মহল, বিশেষ করে মারওয়ান ইবনুল হাকাম তাকে সেখানে দাফন হওয়ার অনুমতি দেয়নি। শিয়া সাহিত্যে হাসান রা. এর জানাজায় বাধা প্রদান ও আক্রমণের তথ্যও দেয়া হয়েছে। যাই হোক, হুসাইন রা. তাঁর ভাইয়ের গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করলেন। মসজিদে নববিতে দাফনের সুযোগ না পাওয়ায় পার্শ্ববর্তী জান্নাতুল বাকীতে তার দাদী ফাতিমা বিনতে আসাদ রা. এর কবরের পাশেই শেষ পর্যন্ত হাসান বিন আলী রা. কে দাফন করা হয়।
এই ইতিহাসগুলো আমাদের বুকে রক্তক্ষরণ ঘটায়। রাসুলুল্লাহ সাঃ এর প্রিয় নাতি, জান্নাতের সর্দার, সর্বোপরি নবিজি সা. এর পরিবার ও বংশধর যাদের ওপর আমরা দুরুদ পাঠ করি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে তাদের ওপর যে রকম জুলুম করা হয়েছে তা অচিন্তনীয়। আমরা ভালো করে এই ইতিহাসগুলো জানি না। আমাদের এখানে সেভাবে আলোচনাও করা হয় না। এ কারণেই আমরা একই ধরনের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ভিকটিমও হয়ে যাই বারবার।
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়েদিনা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ।