25/07/2020
মসলিন
বাংলাদেশের ইতিহাসে আদি ও অকৃত্রিম ঐতিহ্যের এক অনন্য নাম মসলিন তথা ঢাকাই মসলিন। মসলিন অত্যন্ত সূক্ষ, মিহি, বিশুদ্ধ, উজ্বল এবং মোলায়েম একপ্রকার বস্ত্রবিশেষ যা মুঘল আমলের প্রাচীন বাংলার এক অপূর্ব সম্পদ ছিলো। অনেকের মতে ইরাকের বাণিজ্যনগরী মসুল থেকে মসলিন নামটি এসেছে। মসলিন মুঘল আমলের বাদশাহী ও খানদানী নারী-পুরুষ এবং উচ্চপদধারী বিত্তবানদের পোশাক ছিলো।
মসলিন প্রস্তুত করা হতো বর্তমান বাংলাদেশের সোনারগাঁও অঞ্চলে, এছাড়াও ধামরাই, তিতবাড়ি এবং জঙ্গলবাড়িতেও মসলিন বয়ন করা হতো। চিত্তাকর্ষক অপরূপ এ কাপড়টি বোনা হতো হাতে। চড়কায় সুতো কেটে হাতে বোনা এই মিহি কাপড় তৈরিতে প্রয়োজন হতো সর্বনিম্ন ৩০০ কাউন্টের এর সুতো। কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ মসলিন বয়নে ব্যবহৃত অতি চিকন সুতো ফুটি কারপাস নামক তুলো থেকেই তৈরি হতো। কোনরূপ প্যাটার্ন ছাড়াই দক্ষ হাতের কারিগরী দক্ষতায় তৈরি মসলিন এতটাই সূক্ষ ছিল যে একটি আংটির ভেতর দিয়ে প্রায় কয়েক গজ কাপড় প্রবেশ করানো যেত। কথিত আছে যে, মসলিনে তৈরি করা পোশাকসমূহ এতই সুক্ষ্ম ছিলো যে ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিনের কাপড়কে একটি দিয়াশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেতো।
সূক্ষতা, বৈচিত্র্য ও নকশাগত পার্থক্যের মাপকাঠিতে প্রায় আঠাশ প্রকার মসলিন ছিলো যার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ছিলো ‘মলমল খাস’ এবং ‘মলবুস খাস’। নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এগুলো তৈরি হতো খাস বা বিশেষ মানুষের জন্য। মলবুস খাস অর্থ খাস বা আসল কাপড় যা তৈরি হতো সম্রাটদের জন্য। মলমল খাস রপ্তানীও করা হতো। এছাড়াও, সরকার-ই-আলা, ঝুনা, আব-ই-রওয়ান, রঙ, তানজীব, চারকোনা, খাসসা, শবনম, সরবুটি, নয়ন সুখ, বদন খাস, সর-বন্ধ, ডোরিয়া, জামদানী প্রভৃতি রকম মসলিনের চল ছিলো যার প্রতিটিই ছিলো নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে অনন্য।
পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পতনের পর মসলিনের পৃষ্ঠপোষকতা কমতে থাকে এবং মসলিন ক্রমাগত বিলুপ্তির পথে চলে যায়। এর পেছনে ব্রিটিশ কর্তৃক মসলিনের প্রতি অতিরিক্ত আরোপিত কর ও তাঁতিদের বৃদ্ধাঙ্গুলী কেটে নেয়াকে দায়ী করা হয়। আবার অনেকের মতে, তাঁতিরা নিজেরাই এই কাজ ছাড়ার জন্য আঙ্গুল কেটে ফেলেছিলো। বর্তমানে ‘মসলিন’ নামক আধুনিক মিহি কাপড় বাজার দখল করলেও সেই আদি ও খাঁটি মসলিন কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। ক্বদাচিৎ কোন সংরক্ষণশালা, তৈলচিত্র কিংবা জাদুঘরেই আজ এর দেখা মেলে।
www.selaimachine.com