26/12/2025
# # জীবন # #
একটু তাড়াতাড়ি চালাও ভাই, পাঁচ বছরের ছেলের কাছে বাবাকে রেখে এসেছি। ভীষন বুকে ব্যাথা বাবার। রাত দশটার পর গড়িয়া ব্রিজের উপর চোলাই মদের ঢেলে বিকিকিনি। ওই ব্রিজের উপর দিয়ে যেতে হবে পরমাকে। ভয় করছে খুব , প্রকৃতস্থ কেউ না।
দিদি আপনি ভয় পাবেন না। আমি যতক্ষণ আছি ওরা কেউ আপনার ক্ষতি করতে পারবে না। জোরে চালাচ্ছিল রিক্সাটা ,একজন প্রায় টলতে টলতে একেবারে সামনে। নিশ্চিত লাগেনি কিন্তু অযথা গন্ডগোল পাকানোর ইচ্ছায় নোংরা ভাষায় কথা বলতে লাগলো।
ভয়ে আর চিন্তায় পরমা হাতজোড় করে বললো, " পথ ছাড়ুন , ঘরে বাবা অসুস্থ । ডাক্তার এখুনি না নিয়ে গেলে বিপদ হবে।" কি বুঝল ওরাই জানে, পথ ছেড়ে দিলো।
ডাক্তারবাবু নেই আজ বাড়ীতে । বাবাকে তো বরাবর এই ডাক্তারবাবু দেখেন। এখন কি করবে? আর মাথা কাজ করছে না।
দিদি, একটু গেলে আমার পরিচিত একজন ডাক্তারবাবু আছেন। চাইলে নিয়ে যেতে পারি।
যাচ্ছে তো যাচ্ছেই রিক্সা। এবার কেমন অজানা ভয় লাগছে। ছেলেটিকে তো চিনি না। খারাপ উদ্দেশ্যে যদি নিয়ে যায়?
ফিরিয়ে নাও রিক্সা , তুমি ভুল পথে যাচ্ছ। তোমাদের চিনতে তো বাকি নেই। একা মেয়ে পেয়েছো। আর যাবো না আমি। ফিরে চলো না হলে চিৎকার করবো।
ডাক্তারবাবুর বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল বাজালো রিক্সা থেকে নেমে। দরজা খুলে দাঁড়ালো একটি ওর ই বয়েসী ছেলে। "কি হলো রে জীবন , এতো রাতে?"
তুই তাড়াতাড়ি চল ওনার বাবার শরীর ভালো না।
পরমা অবাক, রিক্সাচালক ডাক্তারবাবুকে তুই করে বলছে?
ডাক্তার দেখেই হাসপাতালে ভর্তি করতে বললেন। ইসিজি করে বললেন, একটা এ্যাটাক হয়ে গেছে।যত তাড়াতাড়ি ভর্তি করানো যায়।
একটা এ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলো। ডাক্তারবাবু বলে চলে গেলেন। রাত প্রায় বারোটা। রিক্সাচালক জীবন রয়ে গেল আমার কাছে। রিক্সাটা বাড়ীর কাছে চেইন দিয়ে বেঁধে লক করে বললো , চলুন দিদি আমি যাবো আপনার সাথে।
বিট্টুকে নিতে হলো সাথে। একা রেখে যাওয়া সম্ভব না। এ্যাম্বুলেন্সে তোলা থেকে বাইপাসে হাসপাতালের যাবতীয় অফিসিয়াল কাজ, জীবন একাই করে গেল। পরমা শুধু সইটুকু করেছিল।
এমারজেন্সীতে বাবা। একেবারে একা পরমা আর ছেলে বিট্টু। ডাক্তারবাবু রাতে থাকতে বললেন। কি করবে কিছু মাথায় আসছে না। বড্ড একা আর অসহায় লাগছে।
দিদি , আপনি কাঁদছেন কেন? আপনাকে একা ফেলে আমি যাবো না।
একজন রিক্সাওয়ালা পুরো রাতটা আমাদের জন্য থাকবে বাড়ী না গিয়ে ভাবতে পারছিল না পরমা।
জীবন তুমি তো কিছু খাওনি কিছু খেয়ে নাও। আমি টাকা দিচ্ছি। দিদি, আপনি, বিট্টু খাননি রাতে। আমি আনছি খাবার একটু বসুন ।
সুধীন বোসের বাড়ীর লোককে ভেতরে ডাকছে। জীবন খাবারটা ফেলে রেখে ছুটে গেল । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এনজিওগ্রাম করতে হবে। টাকা জমা দিতে হবে। প্যাকেজের বিবরণ সবটাই দিয়ে দিল।
সারারাত কেটে গেল হাসপাতালে চেয়ারটায় বসে জীবনের ভরসায়।
******
জীবন , তুমি ডাক্তারবাবুকে তুমি বলছিলে ? তুমি চেনো?
থাক দিদি, এসব শুনে আর কি হবে!!
বলো জীবন।
দিদি, আমি আর অনির্বাণ একসাথে স্কুলে পড়েছি। ও ফার্স্ট আমি সেকেন্ড। কখনো উল্টোটাও হতো। ও টিফিন আনতো, আমি নিতে পারতাম না। ও রোজ আমার জন্য আনত। উচ্চমাধ্যমিকে দুজনেই দারুন রেজাল্ট করলাম।
ও জয়েন্ট দিয়ে ডাক্তারী পেলো । আমি এসব ভাবিনি। আমার পরিবারে এসব ভাবতে বারন। মা লোকের বাড়ী বাসন মেজে এইটুকু পড়িয়েছিলেন। মা এখন আর পারেন না। একটা বোন এখনও অবিবাহিত। সকালের কলেজে ভর্তি হলাম , দুপুরে টিউশানি করি। রাত দশটার পর রিক্সা চালাই । টাকাটা একটু বেশী পাবো বলে।
মা এখনও একটা বাড়ীতে রান্নার কাজ করে। বোন পড়ছে ক্লাস ইলেভেনে।
জীবন , আজ তো তোমার কোন আয় হোলো না।
সবসময় টাকার অঙ্কে আয় হয়না দিদি। আজ আমার অনেকটা প্রাপ্তি হলো। দিদি ছিলো না, একটা দিদি পেলাম।
অপরাধ নেবেন না দিদি, আপনি এমন একা কেন। দাদাবাবু কি বাইরে কাজ করেন?
না গো জীবন, বিট্টুর জন্মের পর ওর বাবা কোথায় যে চলে গেল কোন খোঁজ পাইনি। থানা পুলিশ অনেক করেছি। ওর মা অনেক আগেই মারা গেছেন। এখন শুধু ওর বাবা। বাবা বলেছিলেন আমায় বাপের বাড়ী যেতে। পারিনি গো যেতে এখানে বাবাকে একা রেখে। বাবা-মেয়ে আর আমার ছেলে নিয়ে ভালোই তো চলছিলো। কিন্তু হঠাৎ এই বিপর্যয়। তবে তোমায় না পেলে ভাই আজ ভীষন বিপদ হতো।
এমন করে বলবেন না দিদি, মানুষের জন্যই তো মানুষ।
সুধীন বোসের বাড়ীর লোক কে আছেন? দুটো স্টেইন বসাতে হয়েছে। এখন ঠিক আছেন। আপনারা বাড়ি যেতে পারেন। ভিজিটিং আওয়ার্সে আসবেন।
আকাশটা পরিস্কার হয়ে এলো। এখন ঝলমলে সকাল। জীবন তার দিদি আর ভাগ্নেকে নিয়ে বাড়ীর পথে।
মানসী ভট্টাচার্য্য
ছবি সংগৃহীত