21/09/2023
স্কুলেরই বার্ষিক অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন — ‘পাগলা মনটারে তুই বাঁধ’ আর ‘ভাইয়ের দোরে ভাই কেঁদে যায়’, উপস্থিত ছিলেন অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বালক শিল্পীর গান শুনে তিনি অসম্ভব মোহিত,উচ্ছ্বসিত। নিজের আসন ছেড়ে উঠে এসেছিলেন শরৎচন্দ্র, আশীর্বাদ করে বালক গায়কের হাতে তুলে দিয়েছিলেন পাঁচ টাকার একটা নোট,তারপর কেটেছে অনেকগুলি বসন্ত । সেদিনের বালক গায়ক কে চিনেছে গোটা বাংলা, অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন কিন্তু শরৎচন্দ্রের আশীর্বাদ কে জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার বলে মান্যতা দিয়ে এসেছেন। সলিল চৌধুরী তাঁর সম্পর্কে বলতেন মহম্মদ রফি, তালাত মামুদের থেকে কোনও অংশে পিছিয়ে ছিলেন না বরং কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের চেয়েও এগিয়ে, তিনি প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। এক সময় বাংলা গানে তিন মুখ বলতে বোঝাতো জগন্ময় মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যকে।
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
অবশ্য ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য স্বয়ং নিজের মুখেই বারবার বলতেন, গানের জন্য জীবনে দু’জনকে ঈর্ষা করে থাকেন, তাঁদের একজন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। দ্বিতীয় জন তাঁর ছোট ভাই পান্নালাল। বাংলায় ভক্তিগীতিতে একটা সময় বেশ ভাটা এসেছিল। ভাইয়ের প্রতি ছিল অগাধ আস্থা,বিশ্বাস করতেন ভাইটি ভক্তিগীতি গেয়ে মানুষের হৃদয় জিততে পারেন। ঠিক সেই কারণেই পরের পর ছবিতে অসংখ্য হিট গান গাওয়ার পর, হাজার অনুরোধেও দাদা ভক্তিগীতি গাইতে চাইতেন না।বলতেন—ওটা পান্নালালের জায়গা, তাঁর নয়। ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর পর দাদা ধনঞ্জয় কিছু ভক্তিগীতি গেয়েছিলেন।
ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য কে সলিল চৌধুরী থেকে রফি, লতা, শচীনকর্তা অসংখ্যবার অনুরোধ করলেও তিনি বম্বে যাননি নেপথ্যের অন্যতম বড় কারণ শিল্পীর জেদ,মূল্যবোধ, শক্তপোক্ত শিরদাঁড়া, সম্মানবোধ সব এক সরণীতে এসে মিলে যেত।গানের মতোই এ সব তিনি যত্নে বয়ে বেড়িয়েছেন। এই বিষয়ে চমৎকার একটি উদাহরণও দেওয়া যায়। ছোটবেলায় পিতাকে হারিয়ে তাঁর জীবন দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে। মা জননী ছেলেকে শিখিয়েছিলেন সৎভাবে জীবনযাপনের মন্ত্র। একদিন মা জননী পুত্র ধনঞ্জয় কে অচল পয়সা দিয়ে বললেন পয়সাটা কেউ নিচ্ছে না এটা কি সে বাজার থেকে চালিয়ে আনতে পারবে! ধনঞ্জয় সত্যি সত্যি সেই অচল পয়সা বাজারে চালিয়ে মায়ের জন্য কলা কিনে এনেছিলেন। আদপে মা জননী সেদিন পুত্রের সততার পরীক্ষা নিচ্ছিলেন। তিনি ছেলেকে খুব বকলেন।
মায়ের কথা অবশ্য এরপর আর কোনওদিন ভোলেন নি, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের তখন গান করে বেশ নাম ডাক হয়েছে।রোজ স্টুডিয়োপাড়ার কাজ সেরে রাতের শেষ বাসে বাড়িতে ফেরেন। এমন একদিন লাস্ট বাস চলে যাবার আগে কন্ডাকটর তাঁকে বাসে ওঠার অনুরোধ করলেন,সব কন্ডাক্টর তাঁকে চেনেন,পরিচয় জানেন।তবু ধনঞ্জয় বাসে উঠলেন না, কারণ তাঁর কাছে বাসভাড়ার মাত্র এক পয়সা কম ছিল। মা যে শিখিয়েছেন বাসে ভাড়া দিয়ে উঠতে হয়। আজ ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যদের জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সংকলনে ✍🏻 অরুণাভ সেন।।
© ধ্রুবতারাদের খোঁজে
তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার আনন্দবাজার পত্রিকা,দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়, হাসিকান্না হীরাপান্না চণ্ডী লাহিড়ী